চলন্ত ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। কিন্তু তার সমাধান হওয়ার আগেই এখন নতুন সংকটে পড়তে হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষকে। আর সেটি হলো, দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ঘিরে ট্রেন আটকে দেওয়া, ট্রেনে ভাঙচুর চালানো এবং পাথর নিক্ষেপ।
গত সোমবার কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলাকে জেলা ঘোষণার দাবিতে রেলপথ অবরোধ করেন এলাকাবাসী। বেলা ১১টার দিকে ভৈরব রেলস্টেশনে নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেন আটকে ভাঙচুর চালানো হয়। যাত্রীবোঝাই ট্রেনটি লক্ষ্য কতরে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এতে অন্তত ২০ যাত্রী আহত হন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশ কয়েকটি বগি।
এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
রেলওয়ে মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলছেন, ট্রেনে নির্বিচারে পাথর নিক্ষেপে অনেক যাত্রী আহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
যাত্রীবাহী ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করেন তিনি বলেন, ‘জাতীয় সম্পদের ওপর হামলা করা মানে দেশের জনগণের নিরাপত্তা ও সম্পদের ওপর আঘাত হানা। ভৈরবে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ।’
এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যাত্রীদের স্বার্থে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘দাবি আদায়ের নামে ভৈরবে যেটা হয়েছে সেটা সন্ত্রাসীর কাজ। সরকার এদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের ঘটনা সামনে আরও বাড়বে।’
‘অবরোধ হয়, কিন্তু আপনি জেনে শুনে যাত্রীদের ওপর হামলা করবেন? এটা তো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড!’
অবশ্য আন্দোলনের সময় ট্রেনে হামলা ও পাথর ছোড়ার ঘটনা নতুন নয়। গত বছর নভেম্বরে সরকারি তিতুমীর কলেজকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিতে মহাখালীতে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। তাদের এ কর্মসূচির সময় নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা এই উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সে সময় নারী-শিশুসহ বেশ কয়েকজন যাত্রীদের রক্তাক্ত হওয়ার একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয় ।
ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘তিতুমীর কলেজকের ঘটনায় মামলা হয়েছিল। মামলায় দেড় থেকে দুইশজনকে আসামী করে মামলাও হয়েছিলো। কিছুদিনের মধ্যেই এই মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
টাইমস অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ছিল, তার মানে ওই ঘটনায় পুলিশ কোনো অপরাধী পায়নি?
জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সঠিক’।
পুরোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি
চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়া থামাতে গত এক দশকেরও বেশি সময় চেষ্টা করছে রেলওয়ে। কিন্তু খুব একটা কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, রেলওয়ের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করা হচ্ছে চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোড়া বন্ধ করতে।
দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রেলের নেটওয়ার্ক ছোড়া হওয়ার কারণে রেলের পক্ষে একা এটা বন্ধ করা কঠিন।
ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনায় ২০১৮ বেনাপোল কমিউটার ট্রেনের পরিদর্শক বায়েজিদ হোসেন গুরুতর আহত হয়ে ৪১ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আহত হওয়ার ঘটনা তো আছেই। যাত্রী আহত হলে শেষ পর্যন্ত তার খোঁজ রাখে না কেউ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্য বলছে, গত বছর শুধু পশ্চিমাঞ্চলেই ৫৭ টি ট্রেনে ঢিল ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ট্রেনের ৪৮ টি জানালা অথবা দরজার কাঁচ ভেঙে গেছে। আর আহত হয়েছেন ১৭ যাত্রী।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাথর নিক্ষেপপ্রবণ এলাকা টাঙ্গাইল থেকে জয়দেবপুর, টঙ্গী থেকে তেজগাঁও, মিরপুর থেকে পাকশী, ঈশ্বরদী থেকে মাঝগ্রাম ও মীরবাগ থেকে রংপুর।
এ বছরের জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলে ২৬ টি পাথর ছোঁড়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ট্রেনের ২২ টি জানালা অথবা দরজার কাঁচ ভেঙে গেছে। আহত যাত্রীর সংখ্যা ১০। এসব ঘটনাও টাঙ্গাইল থেকে জয়দেবপুর, টঙ্গী থেকে তেজগাঁও, মিরপুর থেকে পাকশী, ঈশ্বরদী থেকে মাঝগ্রাম ও মীরবাগ থেকে রংপুর এলাকায় ঘটেছে।
তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, ‘কোনো ট্রেনের জানালা ভেঙে গেলে সাধারণত ভাঙার ওপর নির্ভর হবে কতদিন পর পরিবর্তন করতে হবে। কারণ, কোনো জানালা কম ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা নিয়েই চালাতে হয়। এটা পুরোপুরি নষ্ট হলেও অনেক সময় চালাতে হয় কারণ সেটা ওয়ার্কশপে নেওয়ার আগে তো শুধু জানালা ঠিক করতে নেওয়া যায় না।’

‘ভাঙা গ্লাস নিয়ে ট্রেন চালালে যাত্রীদের কথা শুনতে হয়, কিন্তু আমাদের তো কিছু করার থাকে না। কারণ সব সময় সব গ্লাস পাওয়া যায় না,’ যোগ করেন তিনি।
রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, রেলওয়ের কর্মচারীর ও যাত্রীর মৃত্যু ছাড়াও প্রতিবছর রেলকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। তিনি বলেন, প্রতিবছর কেবল ট্রেনের জানালা মেরামত করতেই খরচ হয় এক থেকে দুই কোটি টাকা।
কেন পাথর ছোড়া থামানো যাচ্ছে না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ট্রেনে পাথর ছোঁড়া হয় বাইরে থেকে। একেকবার একেক স্থানকে ট্রেন আক্রমণের শিকার হয়। তবে, কোথাও এই ঘটনা বারবার ঘটতে দেখলে আমাদের রেলওয়ে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা সেখানে গিয়ে অভিযান চালায়।’
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, রেলের দীর্ঘ নেটওয়ার্ক রেলের পক্ষে একা এটা করা সম্ভব নয়। তাই রেললাইনের আশপাশের বসবাসকরীদের সচেতনতা বাড়তে হবে।
চট্টগ্রামভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ডি ইন্জিনিয়ার্স ক্লাব ২০১৮ সাল থেকে রেললাইনের পাশে থাকা বস্তিগুলোর শিশুদের চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোঁড়া নিয়ে সচেতনতার কাজ করছে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সোমেন কানুনগো জানান, ট্রেনে পাথর ছোড়ার সংখ্যা কত তার সঠিক কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশু-কিশোররাই মূলত খেলার ছলে ট্রেন ঢিল ছুড়ে থাকে। ট্রেনে ঢিল ছোড়ার ৭০ শতাংশই শিশু-কিশোর।’
ঢিল ছুড়লে কী ক্ষতি হয় এবং আইন সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করা হয় জানিয়ে তিনি ঝুকিঁপূর্ণ এলাকায় যাত্রীদের জানালা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, ‘রেলওয়ের সঙ্গে এক হয়ে সারাদেশে ২৬ জোন চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে সিএমপি চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়তলী থানা, সীতাকুণ্ড থানা, ফেনী জেলার ফেনী সদর থানা, সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ থানা, নরসিংদী জেলার নরসিদী সদর ও পলাশ থানা, পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানা ও ভাঙ্গুরা থানা, বগুড়া জেলার সোনাতলা থানা, গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানা, খুলনা জেলার ফুলতলা থানা সমূহের সকল রেলওয়ে ও রেলওয়ে স্টেশন এলাকা।’
ঢাকা রেলওয়ের থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জায়নাল আবেদিন বলেন, ‘অপরাধীদের ধরা যায় না। একটা ট্রেন ৮০ কিলোমিটার বেগে চলে, একটা পাথর ছোড়া হয়েছে এটা বুঝতে বুঝতে ট্রেন কয়েক কিলোমিটার চলে যায়।’


