দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমানা পানি ব্যবস্থাপনায় আস্থার সংকট রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্বের বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা।
বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড আয়োজিত একাদশ আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের শেষ দিনে এই আস্থার সংকট নিরসনের আহ্বান জানান তারা।
দুইদিনব্যাপী এই ভার্চুয়াল সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল– ‘ন্যায়সংগত ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা পুনর্চিন্তা’। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অংশ নেন বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের ৫ শতাধিক নদী বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতিনির্ধারক, পানি অধিকার কর্মী এবং জলবায়ু সুরক্ষা কর্মী।
সমাপনী অধিবেশনে বক্তারা বলেন, জলবায়ুর অস্থিরতা ও মানুষের অসহায়ত্ব মোকাবিলায় প্রচলিত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ‘পানি কূটনীতি’ ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন নদী ও পরিবেশের প্রবাহ এবং আন্তঃসীমানা জবাবদিহিতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি পানি–সামাজিক বা হাইড্রো সোশ্যাল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের তাগিদ দেন তারা।
‘আন্তঃসীমানা পানি জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সেশন সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।
প্রচলিত কূটনীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি হাইড্রোলজিস্ট, সমাজবিজ্ঞানী ও তরুণদের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারি যারা পানিকে সীমানার ঊর্ধ্বে দেখবে, তবেই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রকৃত সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।’
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন পানির স্বাভাবিক আচরণের নিশ্চয়তা কেড়ে নিয়েছে, যা আমাদের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই পানির ধরন বদলে যাচ্ছে। আমরা কীভাবে চাষাবাদ করব বা বাঁচব, তা এখন অনিশ্চিত। জলবায়ু ন্যায়বিচার কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি মূলত একটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।’
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জয়ন্ত বসু ভূ–রাজনীতির ক্ষেত্রে সংবেদনশীল নদী অববাহিকায় বিশ্বাস পুনর্গঠনে তথ্যের স্বচ্ছতার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘তথ্যই স্বচ্ছতা ও সুস্থিরতা আনে। ৫০ বছরের পুরোনো রেকর্ডের ওপর নির্ভর না করে বর্তমান জলবায়ু বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে হালনাগাদ বা স্বল্পমেয়াদি তথ্যের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে।’
বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈদ সংকীর্ণ পানি–বণ্টন বিতর্কের ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান জানান।
বৈশ্বিক আইনি প্রেক্ষাপট থেকে জাতিসংঘের ওয়াটার কনভেনশন সেক্রেটারিয়েটের সদস্য রেমি কিন্না বলেন, বাংলাদেশের এই কনভেনশনে যোগদান স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বার্তা। এটি দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে শিক্ষা গ্রহণ এবং জবাবদিহিতা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সহায়তা করবে।
মেকং রিভার কমিশনের উদাহরণ টেনে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের লিড স্পেশালিস্ট ড. জন ডোর বলেন, সরকার, গবেষক, সুশীল সমাজ ও যুবসমাজের সমন্বিত উদ্যোগ এক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি।
ঋতুভিত্তিক তথ্য আদান–প্রদান প্রটোকল তৈরি, একটি আঞ্চলিক ‘ওয়াটার স্কুল’ প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে পানি শাসনের কেন্দ্রে রাখার আহ্বানের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।
এছাড়াও সম্মেলনের সমপানী দিনে ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অফ ওয়াটার মিউজিয়ামস‘-এর সমন্বয়ে পানি জাদুঘরগুলোর ডিজিটাল প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।


