আগস্টে মব সহিংসতায় নিহত ২৮, ধর্ষণের শিকার ৭৯ জন

আগস্টে মব সহিংসতায় নিহত ২৮, ধর্ষণের শিকার ৭৯ জন
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির লোগো। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
Advertisement
Advertisement

চলতি বছরের আগস্টে দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির অন্তত ৫৩টি ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ৬২ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৭০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাতজন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জনের বেশি। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত আগস্টের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগৃহীত তথ্য এবং ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা বেড়েছে। জুলাইয়ে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ১৬৪ জন আহত হয়েছিলেন। আগস্টে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২০টি ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও অন্তত ১৫২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের ১৮টি সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৩৩ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের ৭টি সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৬ জন আহত হন। বিএনপি-এনসিপির ৬টি ঘটনায় ১৬ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের ১০টি ঘটনায় ৩৮ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৯টি ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৭১ জন।

ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘর্ষের অন্তত ১৩টি ঘটনায় ২১৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ছাত্রদল-শিবিরের ৮টি ঘটনায় ১৮১ জন এবং ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ৫টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় কোন্দল, হামলা ও চাঁদাবাজিকে এসব সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস।

এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দুষ্কৃতকারীদের হামলার অন্তত চারটি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়েছেন। অন্তত ১২ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ১৯টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে আগস্টে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৬২টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ১২৫ জনের নাম উল্লেখ এবং প্রায় ২ হাজার ২০৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ১৬২টি ঘটনায় ১২ হাজার ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯, বিএনপির ২২, জামায়াতের ৪, এনসিপির ৯ এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ৫ সদস্য রয়েছেন।

সাংবাদিক নির্যাতনের ৩২টি ঘটনায় অন্তত ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন আহত, ৬ জন লাঞ্ছিত, ৭ জন হুমকির শিকার এবং ৫ জন আটক হয়েছেন। সংবাদ প্রকাশের জেরে একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর আওতায়ও একটি মামলায় একজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

মতপ্রকাশ ও সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। আগস্টে ১৩টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার অভিযোগে ৬১ জন আহত ও ৮ জন আটক হয়েছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ৮টি ঘটনায় ১০ জন আটক এবং ৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় পৃথক ৪টি মামলায় ৫ জনকে অভিযুক্ত ও আটক করা হয়েছে।

এদিকে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে আগস্টে ৮২টি ঘটনায় ৮৭টি লাশ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি। এর মধ্যে ১২টি বস্তাবন্দি, ১৭টি ঝুলন্ত, ২৬টিতে একাধিক আঘাতের চিহ্ন, ৯টি গলা কাটা এবং ৮টি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়।

সীমান্ত পরিস্থিতিতেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হামলায় ২ জন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন; সীমান্ত থেকে ৫ জন আটক এবং ৫ জনকে পুশইন করা হয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন এবং জলসীমা থেকে ৩ জনকে আটক করা হয়েছে।

শ্রমিক নির্যাতনের ৮৪টি ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও অন্তত ৬৭ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় আরও ৬৩ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

এ ছাড়া নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ২৪৯টি ঘটনায় ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের ৪৬ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮ জন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪৯ নারী নিহত, ৩১ জন আহত ও ২৩ জন আত্মহত্যা করেছেন। যৌতুকের ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়েছেন।

শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক। আগস্টে ২৮২ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে; তাদের মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ২০৫ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

কারাগারে আগস্টে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন কয়েদি ও পাঁচজন হাজতি ছিলেন।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, আগস্টে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায়ে ছিল। রাজনৈতিক ও ক্যাম্পাস সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্ত সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে ঘটেছে।

তিনি মানবাধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর