যুদ্ধের প্রতিবাদ এবং অস্ত্র রপ্তানিতে বন্দর ব্যবহারের বিরোধিতা করে শুক্রবার বিশ্বের ২২টি দেশের বন্দরে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন ডকশ্রমিকেরা। এ কর্মসূচির ফলে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ৪০ শতাংশের বেশি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হতে পারে বলে দাবি করছেন আয়োজকরা। এতে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য পরিবহনেও অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, স্পেনের বাস্ক অঞ্চল, তুরস্ক ও মরক্কোর ডকশ্রমিক ইউনিয়নগুলোর উদ্যোগে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত ১১৩টি বন্দরের ২৫টির বেশি শ্রমিক সংগঠন সমর্থন জানিয়েছে।
ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরে এ ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে জার্মানির হামবার্গ, স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া ও আলজেসিরাস, ফ্রান্সের লে আভর, গ্রিসের পিরেয়াস, ইতালির জেনোয়া, মরক্কোর তানজের মেড এবং ভারতের নাভা শেভা বন্দর।
তবে কতসংখ্যক শ্রমিক ধর্মঘটে অংশ নেবেন এবং এর ফলে কতটা বিঘ্ন ঘটবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইতালির জেনোয়া বন্দরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সেখানে কর্মসূচির প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। অন্যদিকে গ্রিসের পিরেয়াস বন্দর কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জনিয়েছে, দেশটির দ্বীপগুলোতে ফেরি চলাচল ব্যাহত হতে পারে।
ধর্মঘটে অংশ নেওয়া শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে জার্মানির ভেরডি, আয়ারল্যান্ডের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন এসআইপিটিইউ, ডেনমার্কের থ্রিএফ এবং ফ্রান্সের সিজিটি পোর্টস অ্যান্ড ডকস। ইউরোপের বাইরেও ভারতের প্রায় এক ডজন বন্দরে কর্মসূচির প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। ভারতের ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনও (ডব্লিউটিডব্লিউএফআই) এ কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়েছে।
ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা জানিয়েছে, ধর্মঘটের প্রতি সংহতি জানাতে তারা সমুদ্রে ‘সমন্বিত ও কৌশলগত কর্মসূচি’ পালন করবে। সংগঠনটি গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে ইসরায়েলের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করে আসছে।
একই দিন ইতালির তৃণমূল শ্রমিক সংগঠন ইউনিয়নে সিন্ডাকালে দি বেসে (ইউএসবি) দেশজুড়ে ২৪ ঘণ্টার সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। দেশটির ৪০টির বেশি শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে।
গ্রিসের ডকশ্রমিক, প্রকৌশলী ও নাবিক সংগঠনগুলোও ধর্মঘটে যোগ দিচ্ছে। ফলে শুক্রবার দেশটির বন্দরগুলোতে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকবে। গ্রিসের বৃহত্তম বন্দর পিরেয়াসের ডকশ্রমিকেরা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা পিরেয়াস থেকে শান্তির বার্তা দিতে চাই এবং যুদ্ধের শিকার মানুষের প্রতি সংহতি জানাতে চাই।’ এদিন স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তারা কাজ বন্ধ থাকবে।
অস্ত্র পরিবহনে বন্দর ব্যবহারের বিরোধিতা করে গত মে মাসে ইউরোপের ৩৫টির বেশি দেশের ডকশ্রমিক ইউনিয়ন ‘ইস্তাম্বুল ঘোষণা’ প্রকাশ করে। এতে যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে পাঠানোর জন্য অস্ত্র পরিবহনে বন্দরসুবিধা ব্যবহার না করার দাবি জানানো হয়।
অস্ত্রবাহী জাহাজের চালান আটকে দেওয়ার প্রতিবাদে ইতালির বন্দরগুলো, বিশেষ করে জেনোয়া, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত অস্ত্রের চালানও বিভিন্ন সময় আটকে দিয়েছেন শ্রমিকেরা।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) এ বছরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইউরোপ বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
ধর্মঘটের ঘোষণা দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, ‘বিমান থেকে ট্যাংক, বন্দুক থেকে গুলি, বিস্ফোরক থেকে গোলাবারুদ, ইউনিফর্ম থেকে বুট; আমাদের বন্দরগুলো যুদ্ধ ও গণহত্যার রসদ সরবরাহ এবং পরিবহনের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।’
ভারতের ডব্লিউটিডব্লিউএফআইয়ের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে প্রায় ১৫ জন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আরও অনেক নাবিক সমুদ্রে আটকা পড়েছেন। তাদের মতে, সশস্ত্র সংঘাতের কারণে সমুদ্র পরিবহন খাতের শ্রমিকদেরও বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।


