অব্যবস্থাপনার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া: এক নীরব মৃত্যুফাঁদ

অব্যবস্থাপনার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া: এক নীরব মৃত্যুফাঁদ
ফেরিঘাটে ঝুঁকি। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

পদ্মার উত্তাল জলরাশির বুক চিরে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে এক তীর থেকে অন্য তীরে পৌঁছে দেয় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট। তবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের যাতায়াতের এই প্রধান প্রবেশদ্বারটি এখন আর কেবল পারাপারের পথ নয়, বরং এক বিভীষিকাময় মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

অবকাঠামোগত চরম দুর্বলতা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আর কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার কারণে এখানে জীবনের নিরাপত্তা এখন ভাগ্যের হাতে। সম্প্রতি দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় ২৭ জনের প্রাণহানি এই রুটের কঙ্কালসার অবস্থাকে আবারও সবার সামনে তুলে ধরেছে।

এই নৌরুটের প্রতিটি পরতে পরতে যেন মৃত্যুর হাতছানি। সরেজমিনে দেখা যায়, দৌলতদিয়া  ঘাটের পকেট ও সংযোগ সড়কগুলোতে কোনো মজবুত গাইড ওয়াল বা রেলিং নেই। সড়কগুলো এতটাই ভাঙাচোরা ও খাড়া যে, চালকদের সবসময় বুক ধড়ফড় করে। বিশেষ করে জোয়ার-ভাটার কারণে দৌলতদিয়ার ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ঘাটের পন্টুনের ঢাল কখনো কখনো ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত হয়ে যায়। অথচ প্রকৌশলগত নিয়ম অনুযায়ী এই ঢাল ১৫ ডিগ্রির বেশি হওয়া কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। বৃষ্টি বা ঘন কুয়াশার সময় এই পিচ্ছিল খাড়া পথে ফেরিতে উঠতে গিয়ে প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যাচ্ছে ভারী যানবাহন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় গাড়ির ধাক্কা সামলাতে অন্তত ৪ থেকে ৬ ফুট উঁচু আরসিসি দেয়াল থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে কোথাও কোনো নিরাপত্তা রেলিং নেই, আর থাকলেও তা মাত্র দেড়-দুই ফুট উঁচু যা কার্যত অর্থহীন।

এই পথে দুর্ঘটনার এই মিছিল অনেক দীর্ঘ। অতীতের দুঃসহ স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় যাত্রীদের। ২০১৫ সালে কার্গোর ধাক্কায় ‘এমভি মোস্তফা’ লঞ্চ ডুবে ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২১ সালে ট্রাক ডুবে যাওয়া, ২০২৪ সালে ৯টি ট্রাকসহ ‘রজনীগন্ধা’ ফেরি ডুবি এবং সর্বশেষ বাসডুবির আগেও   ১৭ হাজার লিটার তেলবাহী লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে তলিয়ে যায়।

এসব ঘটনা প্রমাণ করে, কর্তৃপক্ষ এখান থেকে কোনো শিক্ষাই নেয়নি। প্রতি বছর যানবাহন বাড়ছে, কিন্তু নিরাপত্তা বাড়েনি এক বিন্দুও।

আরও পড়ুন

ঘাটের এই করুণ দশা নিয়ে চালক ও যাত্রীদের ক্ষোভ আকাশচুম্বী। দূরপাল্লার বাসচালক রফিকুল ইসলাম আর্তনাদ করে বলেন, এই ঘাটে গাড়ি নামানো মানেই জীবন বাজি রাখা। ব্রেক ফেল করলে গাড়িটি যে ঠেকাবে, এমন কোনো বেষ্টনী এখানে নেই।

নিয়মিত যাত্রী তানিয়া সুলতানার কণ্ঠেও একই আতঙ্ক। তিনি জানান, বাস যখন খাড়া ঢাল দিয়ে নিচের দিকে নামে, তখন জানালার বাইরে তাকালে শুধু নদী দেখা যায়। যে কোনো মুহূর্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ভয়ে তাদের কলিজা শুকিয়ে আসে।

লঞ্চ মালিক রশিদ মল্লিক দুর্ঘটনার জন্য অনিয়ন্ত্রিত কার্গো ও বাল্কহেড চলাচলকে দায়ী করেন। ২০১৫ সালের দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া আব্দুস সালাম জানান, সেই ভয়ংকর ধাক্কা আর মানুষের পানিতে ডুবে যাওয়ার স্মৃতি আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

বিআইডব্লিউটিসির হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এই রুটে অন্তত সাড়ে তিন হাজার ছোট-বড় গাড়ি পার হয়। এত বিশাল আয়ের উৎস হওয়া সত্ত্বেও যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তার বেহাল দশা সবাইকে অবাক করে।

বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলম ঘাটগুলোকে যান চলাচলের উপযোগী দাবি করলেও মাঠের চিত্র বলছে উল্টো কথা। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ অবশ্য আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, ভবিষ্যতে বাসের যাত্রীদের আগে নামিয়ে ফেরিতে গাড়ি তোলা, মজবুত রেলিং নির্মাণ ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে এই ‘ভবিষ্যৎ’ কবে আসবে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—আর কত মায়ের বুক খালি হলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে? কত রক্ত ঝরলে নদীর এই করাল গ্রাস থেকে মুক্তির উপায় মিলবে? কর্তৃপক্ষের দায়িত্ববোধের কি কোনো দিন উদয় হবে না? নদীর কিনারায় ঝুলে থাকা হাজারো প্রাণের এই নীরব আর্তনাদ শোনার মতো যেনো কেউ নেই!

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর