দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আপস না করার ঘোষণা দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার সকালে রাজধানীর শাপলা সম্মেলন কেন্দ্রে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ডিআইজি, পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপরাধ দমনে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা যাবে না। যে অপরাধে জড়াবে, তাকে অপরাধী হিসেবে দেখতে হবে। আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান হতে হবে।
‘একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক, আইনসম্মত ও জনবান্ধব রাষ্ট্র গঠনে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানে রয়েছে।’
তারেক উল্লেখ করেন, অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনে বাধার মুখে পড়েন। তবে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় আনা যাবে না। আইনের রক্ষক হিসেবে পুলিশকে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তারেক আরও বলেন, জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হতে হবে আইনসম্মত ও মানবিক। রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়, এটিও দায়িত্বের অংশ। সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, তবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয় বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটে–এমন কিছু যেন না হয়, সেদিকেও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
রোববার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে বার্ষিক প্যারেড উদ্বোধনের মাধ্যমে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিন তিনি পুলিশ কল্যাণ প্যারেডেও বক্তব্য দেন। পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি এ দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হবে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চায়। এটি শুধু স্লোগান নয়, বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য অর্জনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।
‘মাঠপর্যায়ে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরাই সরাসরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করা গেলে নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে সরকার আরও এগোতে পারবে।’
সীমাবদ্ধতা থাকলেও সক্ষমতা অনুযায়ী এগোতে পারলে সফলতা আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে অপরাধের ধরন দ্রুত বদলেছে। ফলে পুলিশি কার্যক্রমের পরিধিও আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে। এখন অপরাধ শুধু শহর বা জেলাভিত্তিক নয়, ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম’ বৈশ্বিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এ কারণে প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে বহুমুখী দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
পদ নয়, পেশাদারিত্বই বড়
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশ প্রশাসনের প্রতিটি পদই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সব পর্যায়ের কর্মকর্তার মধ্যেই পেশাদার মানসিকতা থাকতে হবে। শুধু পদোন্নতি বা পছন্দের পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করা উচিত নয়।
তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, যার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হবে, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে। তাহলে দক্ষ, গতিশীল ও পেশাদার পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি প্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। তাই এই সভাকে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে দেখতে চান তিনি।
সমস্যা সমাধানে পুলিশকে আন্তরিক হতে হবে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষ, সাহসী, সৎ ও নিরপেক্ষ পুলিশ প্রশাসন ছাড়া কোনো সরকারের সফলতা সম্ভব নয়। মানুষ বিপদে পড়লে প্রথমে পুলিশের কাছে যায়। আন্তরিকতা ও কৌশলী ভূমিকার মাধ্যমে অনেক সমস্যার শুরুতে সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি হলে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেখা দেওয়া মব ভায়োলেন্সসহ নানা সমস্যা সহজে সমাজ থেকে দূর করা সম্ভব হবে।
পুলিশকে হতে হবে জনবান্ধব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় যে জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সরকার এমন পুলিশ প্রশাসন চায়, যারা হবে জনবান্ধব ও জনগণের আস্থাভাজন।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ পুলিশ প্রশাসনকে সরকারের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে। ফলে পুলিশের সফলতা অনেকাংশে সরকারের সফলতা হিসেবেও বিবেচিত হয়।
নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনগণের সঙ্গে করা জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। এ বিষয়ে কারও সন্দেহ থাকার কারণ নেই।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য মানুষের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। তাই সরকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
এর অংশ হিসেবে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও স্পোর্টস কার্ড চালু করা হয়েছে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। শিগগির ‘প্রবাসী কার্ড’ ও ‘এলপিজি কার্ড’ চালুর কথাও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দল-মত নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা সরকারের লক্ষ্য। বন্যা ও খরার প্রভাব কমাতে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এতে পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে, সামাজিক সম্প্রীতিও জোরদার হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশের কল্যাণে সরকারের আশ্বাস
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার পুলিশ বাহিনীর কল্যাণ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকবে। নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে সততা, মেধা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
‘পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দিন-রাত, এমনকি ছুটির দিনেও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।’ যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জনগণ সরকারকে অনেকাংশে পুলিশের আচরণ ও কার্যক্রম দিয়ে মূল্যায়ন করে। তাই রাষ্ট্র পুলিশের কাছে সততা, দক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা ও পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করে। এসব গুণ অর্জন করতে পারলেই ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ–সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি বাস্তব অর্থে সফল হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সালাহ উদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির।
এ সময় অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (সিআইডি) মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক, অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান ও আহম্মদ মুঈদ, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন এবং ডিএমপির উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন সমস্যা ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ে প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।


