জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের কণ্ঠ নকল করে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় চারজনকে আটক করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
এ মামলার প্রধান আসামি এজাজ আহমেদ রাজা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খুলনা নগরের পশ্চিম টুটপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী জি এম আজিজুর রহমানের কাছ থেকে দুই দফায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর খুলনা সদর থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেন তিনি। পরে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়।
মামলায় দেবেন বাবু রোডের এজাজ আহমেদ রাজা (৪৬) ও একই এলাকার শেখ মাহাবুবুর রহমান মামুন (৪৯)-এর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে জি এম আজিজুর রহমান বলেন, তার বড় ভাই জি এম মফিজুর রহমান টিকু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। সাবেক খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি আরিফ তার বড় ভাইকে জানান, হুইপ বকুল তার সঙ্গে কথা বলতে চান। পরে বকুলের নম্বর হিসেবে একটি নম্বর দেওয়া হয়। ওই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের পর তারা গ্রুপ কলে যুক্ত হন।
এজাহার অনুযায়ী, গত ২৯ জুলাই রাত ২টা ৩৮ মিনিটের দিকে ওই গ্রুপ কলে প্লাটিনাম জুট মিলের পুরোনো যন্ত্রাংশ কেনাবেচা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় কথিত বকুল তাকে সকালে পেমেন্ট করার কথা বলেন এবং একজন লোক তার সঙ্গে দেখা করবে বলে জানান।
এর ধারাবাহিকতায় ওই দিন বিকাল ৩টা ১৫ মিনিট থেকে ৪টা ৩০ মিনিটের মধ্যে শেখ মাহাবুবুর রহমান মামুন নিজে না এসে এজাজ আহমেদ রাজাসহ আরও একজনকে খুলনা সদর থানার ২৫ স্যার ইকবাল রোডের আলফি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল কার্যালয়ে পাঠান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। সেখানে পুরোনো যন্ত্রাংশ কেনার পেমেন্ট বাবদ এজাজকে নগদ ২ কোটি টাকা দেন ব্যবসায়ী।
পরে একই হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কথিত বকুলের সঙ্গে আবার কথা হয়। তখন হার্ডবোর্ড মিল নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং তার সঙ্গে ব্যবসায়ী প্লাটিনাম জুট মিল পরিদর্শন করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, মিলের পুরোনো যন্ত্রাংশ পছন্দ হওয়ার পর গত ২ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে এজাজ আহমেদ রাজা ও তার সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তিকে আরও ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেন। এভাবে মোট ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য তিনি যোগাযোগ করতে থাকেন।
পরে কথিত বকুলের সঙ্গে যোগাযোগে তাকে আজ বা কাল দেখা করার কথা বলা হলেও তা হয়নি। গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হুইপ বকুল খুলনায় এলে তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন জি এম আজিজুর রহমান।
তখন বকুল তাকে জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
এরপর বিভিন্ন স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ ও আসামিদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর পর্যালোচনা করে ব্যবসায়ী জানতে পারেন ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে বকুলের পরিচয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এভাবে করে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তার অভিযোগ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর ডিবি পুলিশের এসআই সাইদুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রধান আসামি এজাজ আহমেদ রাজাসহ চারজনকে আটক করা হয়েছে। রোববার বয়রা রায়েরমহল এলাকা থেকে জাকিয়া সুলতানাসহ দুজনকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।’
সোমবার বিকালে মামলার প্রধান আসামি এজাজ আহমেদ রাজাকে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১ মো. আসাদুরজামানের আদালতে হাজির করা হলে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষে প্রেস ব্রিফিং করে সব জানানো হবে।’
এদিকে সোমবার দুপুরে ডিবি কার্যালয়ে মামলার বাদী ব্যবসায়ী জি এম আজিজুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি টাকা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।


