সাভারে খাস পুকুর প্রকল্পে কোটি টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ

সাভারে খাস পুকুর প্রকল্পে কোটি টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ
সাভারে ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দের জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের খাস পুকুর সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হয়ে মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠে আসা একটি পুকুর। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঢাকার সাভারে খাস পুকুর খনন, সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পে অন্তত আটটি পুকুরের মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ১৮টি পুকুরের জন্য ২ কোটি ৬১ লাখ ৭১ হাজার ৩৬০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো পুকুরের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়নে এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে সাভারে ১৮টি ইজারাবিহীন খাস পুকুর ও জলমহাল সংস্কার, উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ সংরক্ষণে প্রকল্পটি নেওয়া হয়।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সাভার উপজেলা এলাকার ১৮টি ইজারাবিহীন খাস পুকুর ও জলমহালসমূহের সংস্কার, উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি চারটি প্যাকেজে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রথম প্যাকেজে বনগাঁও ইউনিয়নের কুমরান, কান্দি বলিয়ারপুর ও বেড়াইদ পুকুরের জন্য ৯ লাখ ৮৬ হাজার ৬৭০ টাকায় মেসার্স রেজিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় প্যাকেজে ধনঞ্জয়পুর পুকুরের জন্য একই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ৩৬ লাখ ১৩ হাজার ৪০ টাকার কার্যাদেশ।

তৃতীয় প্যাকেজে জালেশ্বর-১, জালেশ্বর-২, চারিগ্রাম পশ্চিমপাড়া ও চারিগ্রাম পূর্বপাড়া পুকুরের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকায় মেসার্স জাফর ট্রেডিং করপোরেশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

চতুর্থ প্যাকেজে শিমুলিয়া কাচারিবাড়ি, দেওয়ান বাড়ি, বদরউদ্দিন খান, তাজপুর, কবিরপুর ভুনাবাড়ি, বাইদগাঁও জিহাস, কোনাপাড়া কচুশাক ও বাসাইদ পুকুরের জন্য ৯৫ লাখ ২১ হাজার ৮৫০ টাকায় মেসার্স হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

কার্যাদেশ অনুযায়ী, গত বছরের ১২ নভেম্বর কাজ শুরুর কথা এবং চলতি বছরের ১৬ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন।

অনুসন্ধানে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কয়েকটি পুকুরে খননের নামে পাড় ও তলদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কুমারন, কান্দি বলিয়ারপুর, বেড়াইদ, চারিগ্রাম, বাসাইদ, কাচারিবাড়ি ও তাজপুরসহ কয়েকটি এলাকায় শত শত গাড়ি মাটি সরানো হয়েছে।

শিমুলিয়া ইউনিয়নের কাচারিবাড়ি পুকুর থেকে কমপক্ষে ৫০০ গাড়ি মাটি বিক্রি করা হয়েছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।

কুমারন মৌজার ভবানীপুর এলাকার একটি পুকুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, পুকুরটি গভীর করে খনন করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পুকুরের পাড় উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও মাটির একটি অংশ পাড়ে ফেলার পর বাকিটা অন্যত্র বিক্রি করা হয়েছে। শুধু ওই পুকুর থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের মাটি বিক্রি করা হয়েছে এবং এসব মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

জালেশ্বর-২ পুকুরেও এক্সকেভেটর দিয়ে খননকাজ শুরু হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুকুরের পাড় কেটে মাটি বিক্রি করায় আশপাশের কয়েকটি বাড়িঘর ও পাশের একটি মসজিদ ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে। পরে এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করে দেয়।

তাজপুর এলাকার একটি বিরোধপূর্ণ পুকুর নিয়েও প্রকল্পের কাজ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সেখান থেকে শত শত ট্রাক মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করা হয়েছে। ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এলাকার ইটের সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগে আশুলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানান, অভিযোগ তদন্তে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাজপুরের ওই পুকুরের জমি নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম সরকার। তিনি দাবি করেন, জমিটি তার মালিকানাধীন।

তার অভিযোগ, জমির মাটি কেটে নেওয়া ও গাছ কাটার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির ছয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেছেন।

প্রথম ও দ্বিতীয় প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রেজিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মনিরুল আলম মাটি বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘কোনো পুকুর থেকে মাটি কাটা শুরু হয়নি।’ তবে, কান্দি বলিয়ারপুর পুকুর থেকে ১০ থেকে ১৫ ট্রাক মাটি কেটে কবরস্থান ও স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

মনিরুল আলম বলেন, ‘পুকুরের দখল নিয়ে সমস্যা ছিল। বর্ষার কারণে এখন খননকাজ করা যাচ্ছে না। বর্ষা শেষ হলে কাজ শুরু করা হবে। তার দাবি, প্রকল্পের কাজ ১৬ জুন শেষ হয়েছে এবং পরে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।’

তৃতীয় প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জাফর ট্রেডিং করপোরেশনের পরিচালক তপু বলেন, ‘জালেশ্বর-১, জালেশ্বর-২ ও চারিগ্রাম পূর্বপাড়া পুকুরে কিছু মাটি কাটার কাজ হয়েছে। বর্ষার কারণে পুকুরের তলদেশ থেকে মাটি কাটা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে এবং ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে।’ মাটি বিক্রির অভিযোগকে সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।

চতুর্থ প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক মিজানুর রহমান মিনা বলেন, ‘তাজপুর ও কাচারিবাড়ি পুকুরের কাজ শেষ হয়েছে। এ দুটি পুকুরের কিছু মাটি নিয়ম অনুযায়ী বিক্রি করে সেই অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের অনুকূলে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কোনো বিল এখনো পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাজেট কম হওয়ায় প্রকল্প থেকে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন মালিকের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী মাটি বিক্রির অর্থ জেলা প্রশাসকের অনুকূলে চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে পর্যালোচনা করা চালানের তথ্য অনুযায়ী, মাটি বিক্রির দাবীকৃত পরিমাণের তুলনায় ব্যাংকে জমা দেওয়া অর্থের অঙ্ক কম।

সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তি আছে বলে শুনেছি।’ তবে এখন পর্যন্ত কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, বর্ষাকালে প্রকল্পের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা মাটি নিতে আগ্রহী না হওয়ায় কিছু মাটি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। কাজের সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর