অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। তিনিই পড়েছেন এখন তুমুল রাজনৈতিক ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে। খুঁজে চলেছেন সমাধানের দিশা। মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় একের পর এক নাটকীয় ঘটনা ঘটে চলেছে দেশে, যা তার সরকারের প্রতিশ্রুত সংস্কার কার্যক্রমকে ফেলেছে হুমকির মুখে।
টানাপোড়েনের শুরু মূলত বুধবার সেনাবাহিনী প্রধানের এক ভাষণের মাধ্যমে, যা তিনি বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিয়েছেন। তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরাতে চান, এমন বার্তা দিয়েছেন। আঞ্চলিক করিডরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত বলেও তিনি মত দেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি তার অসন্তুষ্টির স্পষ্ট প্রকাশ ছিল এই ভাষণে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোভাব থেকে বোঝা যায়, কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তৈরি কলঙ্কিত ‘মব কালচার’ বন্ধ দেখতে চান। এসব বিষয় নিয়ে যদিও আগে থেকে জনমত তৈরি হয়েছিল।
সবশেষে বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর জনসংযোগ অফিস এমন ৬২৬ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যারা ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যাদের বেশিরভাগই পুলিশ কনস্টেবল। এ ঘটনা নিয়ে অনেকেই সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করে আসছিলেন, যাদের মধ্যে সরকার ঘনিষ্ঠরাও আছেন। তালিকাসহ আইএসপিআর-এর প্রেসবিজ্ঞপ্তি অনেক বিষয় স্পষ্ট করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে সমালোচনাকারীদের।
এর আগে হাইকোর্ট বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পথ উন্মুক্ত করে দেয়, যা একপক্ষে উল্লাস এবং অন্যপক্ষে ক্ষোভের সঞ্চার করে।
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান সংগঠক সারজিস আলম ফেসবুকে লিখে এই রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। ‘যদি মব হাইকোর্টের রায় প্রভাবিত করতে পারে, তবে হাইকোর্ট থাকার মানেই কী? এছাড়াও তিনি বিচারব্যবস্থাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত অভিযুক্তরা নিয়মিত জামিন পায়, অথচ পূর্ববর্তী দমন-পীড়নের শিকাররা কারাগারে পচে মরছে।
নাটকীয়ভাবে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় যখন সারজিস অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের পদত্যাগ দাবি করেন এবং আগের শাসনামলে সংঘটিত সহিংসতার জন্য দায়হীনতার সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ‘হাসিনার নির্দেশে এত রক্তপাত হয়েছে, অথচ নয় মাসে একটি হত্যামামলাও নিষ্পত্তি হয়নি।’
অন্যদিকে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, যিনি বর্তমানে বিএনপির আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য, তিনি বিকেলে এক ফেসবুক বার্তায় ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমি আর একদিনও সরকারে থাকি, তবে আমি আন্দোলনে জড়িত সকল শক্তির প্রতি পূর্ণ সম্মান ও সংবেদনশীলতা নিয়ে কাজ করতে চাই।’
তার এই সমঝোতামূলক বার্তার বিপরীত সুর ছিল আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বক্তব্যে, তিনি ফেসবুকে তীব্র আক্রমণ করে লেখেন, ‘আ.লীগ, উত্তর ও দিল্লির সঙ্গে যে জোট করছেন, সেই কুমিরই আপনাদের গিলে খাবে।’ এনসিপির তরুণ নেতাদের এলোমেলো বার্তা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।
ওদিকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে শপথের দাবিতে তারর সমর্থকেরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন, আদালতের রায়ের পর তারা আন্দোলন ৪৮ ঘণ্টার জন্য স্থগিত করেন। তবে ইশরাক বলেন, সরকার কী করে তা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। তারা তরুণ উপদেষ্টা মাহফুজ এবং সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগের দাবিতে আপোষহীন বলেও জানান তিনি।
তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন যে ‘বহিঃশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা’ সংস্কার প্রক্রিয়া ছিনিয়ে নিতে চাইছে। তিনি ১/১১-র মতো সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করেন। ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন চায় এনসিপি, তবে ‘সংশোধনের নামে আরেকটি সামরিক-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ’ আনার বিরোধিতা করেন তিনি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে যখন প্রধান উপদেষ্টা ইউনুসের সম্ভাব্য ‘পদত্যাগের ইচ্ছা’ রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল আলোড়ন তোলে।
বৃহস্পতিবার রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, নোবেল বিজয়ী ইউনূস ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে কাজ করতে পারছেন না। নাহিদ তাকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐক্যমতে না আসে, তাহলে আমি কাজ করতে পারব না।’
নাহিদের মতে, ইউনূস গভীর হতাশায় ভুগছেন এবং রাজনৈতিক শক্তির কাছে ‘জিম্মি বোধ’ করছেন। ‘যদি তিনি সব পক্ষের আস্থা না পান, তবে থাকার মানে কী?’ -বলেন নাহিদ। জাতীয় স্থিতিশীলতার স্বার্থে প্রধান উপদেষ্টাকে তিনি ‘পদত্যাগ না করার’ অনুরোধ জানান বলে দাবি করেছেন।
এই খবর এমন সময়ে আসে যখন বিএনপি তিনজন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, সজীব ভূঁইয়া ও খালিলুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে এনসিপি নেতারা ‘বিএনপি ঘনিষ্ঠ’ দাবি করে আসিফ নজরুলসহ অন্য তিনজন উপদেষ্টার পাল্টা অপসারণ দাবি করেছে।
ঘোলাটে এ পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস কী ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা জানতে উদগ্রীব সারাদেশ।


