অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আবারও রেকর্ড গড়ল সোনার দাম। বিনিয়োগকারীরা যখন শেয়ারবাজারের পতন ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতায় নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন, তখন সোনার দাম আকাশছোঁয়া পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার স্পট মার্কেটে দাম বেড়ে আউন্সপ্রতি দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩৩২ দশমিক ১৭ ডলার। এর আগে ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৩৭৮.৬৯ ডলার ছুঁয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ডিসেম্বর সরবরাহের জন্য সোনা ফিউচারসের দামও ১ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৩৪৫ দশমিক ৯০ ডলার হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে দাম বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ, যা ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক উত্থান। সে সময় বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকট শুরু হয়েছিল লেহম্যান ব্রাদার্স ব্যাংকের পতনের মধ্য দিয়ে।
জার্মানির হেরাউস মেটালসের ব্যবসায়ী আলেকজান্ডার জুম্ফে বলেন, ‘সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং ব্যাংক খাতের উদ্বেগ সব মিলিয়ে সোনার জন্য পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনুকূল। তবে দাম অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্থিতি আসতে পারে।’
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে সোনার রিলেটিভ স্ট্রেংথ ইনডেক্স ৮৮-তে দাঁড়িয়েছে, যা নির্দেশ করে দাম এখন ‘অতিরিক্ত ক্রয়’ অবস্থায় আছে।
অন্যদিকে, স্পট মার্কেটে রূপার দাম ০ দশমিক ৪ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৫৪ ডলারে নেমেছে। যদিও সপ্তাহজুড়ে রূপার দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ধস নামার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ব্যাংকগুলোর শেয়ারপতন ভূমিকা রেখেছে। এতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বিক্রি করে সোনায় বিনিয়োগ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার আরও একটি সুদের হার কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, ফেড ২৯-৩০ অক্টোবরের বৈঠকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট হারে সুদ কমাতে পারে এবং ডিসেম্বরেও আরও এক দফা হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উত্তেজনা আবারও বাড়ছে। চীন বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে জানিয়েছে, তারা এই নীতি প্রত্যাহার করবে না।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ ক্রয় বৃদ্ধি, ডি-ডলারাইজেশন এবং শক্তিশালী এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) প্রবাহকে এই উত্থানের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সোসিয়েতে জেনেরালের পণ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান মাইকেল হেইগ বলেন, ‘বাজারে ইটিএফ প্রবাহই মূলত দামের ঊর্ধ্বগতি টানছে।’
বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণভিত্তিক ইটিএফ এসপিডিআর গোল্ড ট্রাস্ট জানিয়েছে, তাদের মজুত বেড়ে ১ হাজার ০৩৪ দশমিক ৬২ টন হয়েছে, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ।
আন্তর্জাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি ২০২৫ সালের সোনার গড় মূল্যপ্রত্যাশা ১০০ ডলার বাড়িয়ে আউন্সপ্রতি ৩ হাজার ৪৫৫ ডলার করেছে। তাদের ধারণা, ২০২৬ সালে এর দাম ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
অন্য মূল্যবান ধাতুর মধ্যে প্লাটিনামের দাম ৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৭৫ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ২ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৫৭৮ দশমিক ০৭ ডলার হয়েছে।
দেশের বাজারেও সোনার দাম রেকর্ড গড়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের দাম ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩২ টাকা, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৬ হাজার ৪৯৯ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৭৭ হাজার ১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরির দাম ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৫১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একইভাবে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা ৬ হাজার ২০৫ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।


