নিষেধাজ্ঞা শুধু কাগজে, সিলেটে প্রকাশ্যে পাথর-বালু লুট

নিষেধাজ্ঞা শুধু কাগজে, সিলেটে প্রকাশ্যে পাথর-বালু লুট
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী লোভাছড়া থেকে জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রাম বাজার পর্যন্ত নদী পথের দূরত্ব অন্তত ২০ কিলামিটার। লোভাছড়া থেকে দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন শত শত বারকি নৌকা দিয়ে পাথর আনা হয় আটগ্রাম বাজারে। সেখানে ক্রাশার মেশিনে পাথর ভেঙে ট্রাকে করে পাঠানো হয় সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

দিনেরাতে সমানতালে লোভাছড়া কোয়ারি থেকে এভাবেই পাথর লুট করে পাচার করা হচ্ছে। অথচও লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতে কোনো বৈধ ইজারা নেই।

পরিবেশগত কারণে কোয়ারিটি দীর্ঘদিন ধরে ইজারার বাইরে রাখা হয়েছে। এছাড়াও পাথর উত্তোলন না করতে আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু এসব নির্দেশনা কেবলই কথার কথা।

জেলার অন্যান্য কোয়ারি থেকেও পাথর ও বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞার পরোয়া করছে না পাচারকারীরা। গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি ও জাফলং, কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর ও শাহ আরেফিন টিলা, কানাইঘাটের লোভাছড়া এবং জৈন্তাপুরের সারি-৩, বাইরাখেল, বাওনহাওর, শ্রীপুর, রাংপানি এলাকায় নদী ও তীর থেকে পাথর-বালু তোলার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি স্থানে বালুমহাল ইজারা থাকলেও ইজারাবহির্ভূত এলাকাতেও চলছে বালু উত্তোলন।

কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদী থেকে সংগ্রহ করা পাথর ও বালু ছোট নৌকায় করে তীরে নেওয়া হচ্ছে। পরে সেগুলো বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে ট্রাকে পরিবহন করা হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকেরা নদীর তলদেশ থেকে পাথর তুলছেন। আবার কোথাও নদীর তীর ও ফসলি জমি কেটে বালু তোলার অভিযোগ রয়েছে। এতে নদী, বসতবাড়ি, কৃষিজমি, কবরস্থান, শ্মশান ও বাঁধ ঝুঁকিতে পড়ছে।

সিলেটের আটটি পাথর কোয়ারি দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে হস্তচালিত পদ্ধতিতে ইজারা দেওয়া হলেও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে ২০১৫ সালে জাফলংকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। এর আগে ২০১৪ সালে হাইকোর্ট আটটি কোয়ারিতেই যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে। পরে ২০২০ সালে সরকার সব কোয়ারিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করে।

স্থানীয়রা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ের কয়েক দিনের মধ্যেই শুধু জাফলং এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাথর সরিয়ে নেওয়া হয়। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটন এলাকাও অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় পাথরশূন্য হয়ে পড়ে।

২০২৫ সালের মার্চে জাফলংয়ে অবৈধ পাথর উত্তোলনের ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর ৩১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে ভোলাগঞ্জ এলাকায় পাথর লুটের ঘটনায়ও মামলা হয়। একই বছরের আগস্টে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান শুরু করে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এলেও এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অবৈধ উত্তোলন এখন নদীর তলদেশ ছাড়িয়ে সেতুর পিলার, টিলা এমনকি ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর আশপাশেও পৌঁছে গেছে। গোয়াইনঘাটের জাফলং সেতু ও কোম্পানীগঞ্জের ঢালাই সেতুর পিলারের কাছ থেকে বালু তোলায় স্থানীয়দের মধ্যে সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি জাফলং রাজবাড়ির ভেতরেও মাটি খুঁড়ে পাথর সরানোর অভিযোগ উঠেছে।

আরও পড়ুন

জাফলং এলাকার বাসিন্দা মুন্না হোসেন বলেন, “আগে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে বালু-পাথর লুটপাট কিছুটা বন্ধ ছিল। এখন আবার আগের মতো শুরু হয়েছে। টহল এলে শ্রমিকরা সরে যায়, টহল চলে গেলে আবার কাজে নেমে পড়ে।”

আরেক বাসিন্দা নূরুল ইসলাম বলেনন, “নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে নেওয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে যাচ্ছে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিবেশও স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়ছে।”

লোভাছড়ায় ইজারা নেই, তবু পাথর পরিবহন 

কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতে বর্তমানে কোনো বৈধ ইজারা নেই। পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে দীর্ঘদিন ধরে কোয়ারিটি ইজারার বাইরে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া লোভাছড়া থেকে পাথর পরিবহন ও স্থানান্তরের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।

তার পরেও প্রতিদিন শত শত বারকি নৌকায় করে কোয়ারি থেকে পাথর সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একটি নৌকা ভর্তি পাথর ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

লোভাছড়া নিয়ে বিতর্ক নতুন করে নয়। ২০২০ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর সেখানে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট পাথর জব্দ করেছিল। পরে জব্দ করা পাথরের একাংশ নিলামে বিক্রি হলেও বাকি পাথর লুটের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। একপর্যায়ে হাইকোর্ট লোভাছড়া থেকে পাথর পরিবহন ও স্থানান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন।

২০২৫ সালে সরকার পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় লোভাছড়াসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পাথর কোয়ারির ইজারা কার্যক্রম স্থগিত রাখে। এর পর গত মে মাসে সিলেট বিভাগের পাথর ও বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারিগুলোর অবস্থা পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি লোভাছড়া পরিদর্শন করে।

কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া ফেরদৌস টাইমস অব বাংলাদেশে’র প্রশ্নে বলেন, “লোভাছড়া থেকে যাতে কেউ বালু পাথর নিতে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিজিবিকেও বলা হয়েছে। এ নিয়ে নিয়মিত অভিযানও চলছে।”

পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরার সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম বলেন, “৫ আগস্টের পর যে পরিমাণ লুটপাট হয়েছে, তা গত দেড় দশকের ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রশাসন সেটি ঠেকাতে পারেনি। এখন আবার কোয়ারি চালুর চিন্তা করা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) সিলেট আঞ্চলিক সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, “সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক, তা যেন আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।”

জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুনন্দা রায় বলেন, “আমরা বারবার অভিযান পরিচালনা করছি। তবুও থামছে না। যখন অভিযানে যাই তখন বন্ধ থাকে। আবার চলে আসি, তখন ফের লুট শুরু হয়।”

তার মতে, এটার একমাত্র সমাধান ইজারা বন্ধ করা। কারণ, যে জায়গায় ইজারা দেওয়া হয়, লোকজন পরবর্তীতে ওই জায়গার আশেপাশে সবখানে বালু পাথর উত্তোলন শুরু করে।

জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজিত কুমার চন্দ বলেন, “আটগ্রাম এলাকায় কয়েকদিন আগেও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু লোভাছড়া থেকে পাথর আসা বন্ধ না হওয়ায় এটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।”

সিলেটের ডিসি আবদুল্লাহ আল মামুনকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালেও জবাব আসেনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর