নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে দিশেহারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকেরা

নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে দিশেহারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকেরা
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাঠে মাঠে এখন আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত কৃষক-কৃষাণীরা। সূর্য ওঠার আগেই লাঙ্গল, ট্রাক্টর আর ধানের আঁটি নিয়ে মাঠে নেমে পড়ছেন চাষিরা। নাচোল, গোমস্তাপুর, শিবগঞ্জ কিংবা সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাদা-পানিতে একাকার হয়ে নারী-পুরুষ কৃষকেরা দল বেঁধে আমনের চারা রোপণ করছেন।

তবে রোপণের এই ভরা মৌসুমে সারের চরম সংকট ও বাড়তি দামের কারণে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। সরকারের নির্ধারিত দামে মিলছে না রাসায়নিক সার। সরকারি ভর্তুকির সার সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। কৃষি দপ্তর বরাদ্দ বাড়ালেও মাঠে তার কোনো সুফল পাচ্ছেন না প্রান্তিক কৃষকেরা। অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে খালি হাতে ফিরে বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে ডিলারদের দাবি, সরকারি গুদাম থেকে যে পরিমাণ সার সরবরাহ করা হচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় দু-এক দিনে ফুরিয়ে যাচ্ছে।

জেলার কয়েকটি প্রান্তিক বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিসিআইসি ও বিএডিসি অনুমোদিত বেশিরভাগ ডিলারের দোকানে সার নেই। তবে অলিখিতভাবে পাশের খুচরা দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত সার মিলছে, যেখানে হাঁকা হচ্ছে অতিরিক্ত দাম।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০, এমওপি ১ হাজার এবং ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রির কথা। অথচ মাঠের কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ডিলারদের কাছে সার না পেয়ে তাঁর টিএসপি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় এবং ডিএপি ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। ইউরিয়া প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। অভিযোগ রয়েছে, ডিলাররা দোকান খোলার অল্প সময়ের মধ্যেই ‘মজুত শেষ’ বলে দেন এবং নির্ধারিত সরকারি মূল্যের কোনো ক্যাশ মেমো দিতে চান না।

নাচোল উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার কৃষি কার্ড থাকার পরও তিন দিন ঘুরে ডিলারের কাছ থেকে এক বস্তা টিএসপি কিনতে পারিনি। ডিলার বলে সার নাকি আসেনি। কিন্তু বাজারের পাশের দোকানে অতিরিক্ত ৪০০ টাকা দিলে সারের অভাব হয় না। সাধারণ কৃষকদের এভাবে জিম্মি করে পকেট কাটা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

শিবগঞ্জের কানসাট বাজারের এক বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারের দোকানে গিয়ে দেখা যায় তা সারশূন্য। ডিলার জানান, জুলাই ও আগস্ট মাসে যে পরিমাণ বরাদ্দ পেয়েছেন, তা দু-তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। তবে তাঁর দোকানের পাশেই এক খুচরা দোকানে এক বস্তা ডিএপি সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করতে দেখা যায়। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই দোকানের এক কর্মচারী জানান, মধ্যস্বত্বভোগী ও ডিলারদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সার সংগ্রহ করায় দাম কিছুটা বেশি পড়ে।

এদিকে গত ৮ আগস্ট নাচোলে সার পাওয়ার আশায় ভোর থেকেই শত শত কৃষক বিসিআইসি ডিলারদের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান। একপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরবর্তীতে নাচোলে সদরের পাঁচ ডিলারের মাধ্যমে সরকারি ন্যায্যমূল্যে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বস্তা ইউরিয়া, এমওপি ও ডিএপি সার বিতরণ করা হয়। ভোগান্তি হলেও শেষ পর্যন্ত সার পেয়ে কৃষকদের মুখে স্বস্তির ছাপ দেখা যায়। নাচোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সলেহ্ আকরাম জানান, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কিছুটা কম পাওয়ায় সাময়িক জটিলতা হয়েছিল, যা দ্রুতই কেটে যাবে।

অন্যদিকে, ১২ আগস্ট গোমস্তাপুরে সার সংকটের প্রতিবাদে রহনপুর ইউনিয়নের কৃষকেরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন। পরে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিল্লুর রহমানের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাকলাইন হোসেন জানান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ডিলার সময়মতো সার না তোলায় সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছিল; ডিলার সার উত্তোলন করলে সংকট থাকবে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) আতিকুল ইসলাম জানান, চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে জেলায় মোট ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৭০ শতাংশের বেশি জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মৌসুমে গত বছরের তুলনায় সার বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে ডিলারদের অব্যবস্থাপনা, সময়মতো সার না ছাড়া এবং সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণেই বাজারে এই বৈষম্য দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় সচেতন মহলের।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মো. আবু সালেহ মোহম্মদ মুশা জানান, কোনো কৃষকের লিখিত অভিযোগ না থাকলেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘অনুসন্ধানে প্রমাণিত হলে যে কোনো ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কিংবা নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকাও বেশি নিলে তাৎক্ষণিকভাবে তার ডিলারশিপ বা লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর