ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগে বিতর্কিত বাহিনী র্যাবের নাম বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন বিএনপি সরকার। মূলত আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অথচ অতীতে র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিল এই বিএনপি।
দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি সরকার এই বাহিনীকে বিলুপ্তির উদ্যোগ নেয়নি। উল্টো নতুন নাম ও নতুন চেহারায় একে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাহিনীর জন্য নতুন প্রশিক্ষণ একাডেমি করা হচ্ছে, কেনা হচ্ছে ১৬৩টি নতুন গাড়ি। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে র্যাবকে আরও শক্তিশালী করার পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার।
প্রতিষ্ঠা ও বর্তমান সংকট
বিএনপি তাদের আগের শাসনামলে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ পুলিশের এই বিশেষ শাখা গঠন করে। এরপর সে বছরের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে র্যাব। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস দমন ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই বাহিনী তৈরি হয়েছিল। শুরু থেকেই এতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং বিজিবির সদস্যদের যুক্ত করা হয়।
কিন্তু দিন দিন এই বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম ও ক্রসফায়ারের অভিযোগ বাড়তে থাকে। এর জেরে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং এর ৭ জন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যা এখনো উঠে যায়নি।
নানা সমালোচনার পরও আগের আওয়ামী লীগ সরকার র্যাবের কার্যকলাপে লাগাম টানেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই বাহিনীর কাজ কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। সম্প্রতি নতুন নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, সরকার এখন এই বাহিনীর নাম পরিবর্তন ও এর জন্য নতুন আইন তৈরি করছে।
শুরু থেকেই বিতর্ক
র্যাব তৈরির পর থেকেই এটি একদিকে যেমন আলোচনায় ছিল, অন্যদিকে তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছে। কালো পোশাক, কালো সানগ্লাস, আর পুলিশের চেয়ে আধুনিক ও উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে বাহিনীটি আলাদা নজর কেড়েছিল। বড় বড় অপরাধ দমনে দ্রুত অ্যাকশন নেওয়ার কারণে শুরুতে এরা বেশ জনপ্রিয়তাও পায়। বিশেষ করে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে র্যাবের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে মুদ্রার অন্য পিঠে ছিল অন্ধকার। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের দমন ও গুম করার অভিযোগে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে প্রচণ্ড সমালোচিত হয় র্যাব। বিনা বিচারে আটকে রাখা, বেআইনিভাবে জিজ্ঞাসাবাদ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার পুরোনো অনেক অভিযোগ রয়েছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে।
নারায়ণগঞ্জের ছাত্রদল নেতা মমিন উল্লাহ ডেভিড ঢাকার এক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুমের ঘটনা দেশে-বিদেশে তুমুল সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে বিএনপি নেতা ইলিয়াছ আলী ও চৌধুরী আলমের গুম হওয়া এবং সালাউদ্দিন আহমদের রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার পেছনে র্যাবের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। এরপর নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার পর তো মানুষ র্যাবের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।
এ ছাড়া ২০১৪ সালের ১৬ এপ্রিল পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে ফতুল্লা থেকে অপহরণ করা হয়। পরদিন তাকে মিরপুর থেকে চোখ বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হলে এই ঘটনাতেও র্যাবের নাম জড়িয়ে আলোচনা হয়। ঝালকাঠির কলেজছাত্র লিমন হোসেনের পায়ে গুলি করার ঘটনাতেও র্যাব তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এমনকি অপহরণ, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো সাধারণ অপরাধেও বিভিন্ন সময় জড়িয়ে পড়ে এই বাহিনীর সদস্যদের নাম। সম্প্রতি গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্যেও জানা গেছে, অতীতের অনেক গুমের ঘটনার পেছনে র্যাবের একটি বড় অংশের যোগসূত্র ছিল।
খোলস বদল ও নতুন উদ্যোগ
সম্প্রতি র্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, র্যাবের নাম বদলে ফেললে হয়তো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উঠে যেতে পারে। তিনি জানান, র্যাবকে আরও জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল করতে একটি নতুন আইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে এলিট ফোর্স হিসেবে বাহিনীর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
মন্ত্রী জানান, র্যাবকে নতুন রূপ দেওয়া হবে, নাকি নাম বদলে পুরোপুরি নতুন কোনো এলিট ফোর্স তৈরি করা হবে এনিয়ে সরকার এখন ভাবছে।
তিনি বলেন, কিছু কর্মকর্তার অপকর্মের কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দু-একজনের দায় পুরো বাহিনীর ওপর পড়ে না।
এর পরদিন সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, র্যাব বর্তমানে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) একটি আইন দিয়ে চলছে। তাই তাদের জন্য এখন একটি নতুন আইন তৈরির কাজ চলছে।
বিলুপ্তির দাবি থেকে উল্টো পথে বিএনপি
২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার পর থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং দলের অন্য নেতারা প্রতিনিয়ত র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এমনকি ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বরেও দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি তোলে।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির অবস্থান পুরোপুরি বদলে গেছে। তারা এই বাহিনীকে বিলুপ্ত না করে উল্টো এর পেছনে বড় অঙ্কের টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রায় ১২২ কোটি টাকা খরচ করে র্যাবের জন্য ১৬৩টি নতুন গাড়ি কেনা হচ্ছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশের সঙ্গে র্যাবের জন্যও একটি নতুন প্রশিক্ষণ একাডেমি তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরেই র্যাব বিলুপ্ত করার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে র্যাব সদস্যদের বাদ দিতে ২০২২ সালে ১২টি আন্তর্জাতিক সংস্থা যৌথভাবে আবেদন করেছিল। এর মধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিও) অন্যতম, যারা র্যাবকে একটি ‘ডেথ স্কোয়াড’ বা মৃত্যু বাহিনী বলে আখ্যা দিয়ে এটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল।
এ ছাড়া অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস (এফআইডিএইচ), এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি), ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অ্যাগেইন্সট টর্চার (ওএমসিটি) এবং এশিয়ান ফেডারেশন অ্যাগেইন্সট ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (এএফএডি)-এর মতো বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছে।


