নড়াইলে যত্রতত্র পাট জাগ: দূষিত হচ্ছে নদীর পানি

নড়াইলে যত্রতত্র পাট জাগ: দূষিত হচ্ছে নদীর পানি
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

নড়াইলের চিত্রা ও নবগঙ্গা নদীতে যত্রতত্র পাট জাগ দেওয়ায় নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। পানি দূষণের কারণে দেশি মিঠাপানির মাছের বংশ একেবারে লোপ পেয়েছে। চরম ঝুঁকিতে পড়েছে সার্বিক জীববৈচিত্র্য।

কৃষকেরা বলছেন, পানি নষ্ট হচ্ছে জেনেও বাধ্য হয়ে তারা নদীতে পাট জাগ দিচ্ছেন। আশপাশে পাট জাগ দেওয়ার মতো অন্য কোনো পানির ব্যবস্থা নেই। তবে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এই সংকট কাটাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নবগঙ্গা নদী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, চোখ যত দূর যায় কোথাও মাছ ধরার নৌকা বা জেলেদের জাল ফেলার দৃশ্য নেই। চিরচেনা গ্রামীণ রূপ বদলে নদীর বড় একটি অংশ এখন চাষিদের পাটের দখলে। পচানোর জন্য পানির নিচে তলিয়ে রাখা হয়েছে পাটের স্তূপ। পচা পাটের আঁশে দূষিত হচ্ছে পুরো নদীর পানি।

চিত্রা নদীর অবস্থা আরও খারাপ। নড়াইল শহরের সব ড্রেন ও নদীর পাড়ের ঘরবাড়ির বর্জ্য ফেলার লাইন সরাসরি নদীতে এসে পড়েছে। নদীর পচা পানির দুর্গন্ধে আশপাশের বাতাসে টেকা দায়। একসময় যে নদীর পানি কাচের মতো পরিষ্কার ছিল, তা এখন কুচকুচে কালো হয়ে ব্যবহারের একেবারে অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নড়াইলে বহুকাল ধরেই প্রচুর পাট চাষ হয়। আগে কৃষকেরা পাটখেতের কাছে পুকুর, খাল, নালা বা নিচু জলাশয়ে পাট জাগ দিতেন। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর বেশিরভাগই ভরাট বা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে কৃষকেরা এখন চিত্রা ও নবগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদী-খালে পাট জাগ দিচ্ছেন।

তারা আরও জানান, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে পানি আসা কমে গেছে। এমনিতেই নদী দুটি নাব্যতা হারিয়ে অগভীর হয়ে পড়েছে। তার ওপর স্রোত না থাকায় পচা পাটের কারণে খুব দ্রুত পানি দূষিত হয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন

প্রতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই চার মাস নদীর মিঠাপানি মারাত্মক দূষিত থাকে। দিনের পর দিন এই দূষণ চলায় পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। ফলে মাছের প্রজনন বন্ধ হয়ে একপর্যায়ে সব মাছ মরে সাফ হয়ে গেছে।

অথচ একসময় দেশি মাছের জন্য চিত্রা ও নবগঙ্গার দেশজুড়ে নাম ছিল। চিংড়ি, রিঠা, চেলেন্দা, চাপিলা, টাটকিনি, পদ্মা বাউশ, ভেটকি, বাতাসী, বাচা, সরপুঁটি, পাবদা, বোয়াল, আড়, চিতল, রুই ও কাতলার মতো হরেক পদের সুস্বাদু মাছ এখন এই নদী দুটো থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে।

কৃষকদের দাবি, নদীতে পাট পচালে নদীর ক্ষতি হয় আর মাছ পাওয়া যায় না, কথাটা সত্যি। কিন্তু অন্য কোথাও পর্যাপ্ত পানি না থাকায় তাদের আর কোনো পথ থাকে না। তাছাড়া বিলে বা ডাঙায় পাট জাগ দিতে নেওয়ার পরিবহন খরচ অনেক বেশি। আবার নদীতে পাট জাগ দিলে আঁশের রং ও মান ভালো হয়। তাই কৃষকেরা নদীকেই বেছে নেন।

নদী দূষণ বন্ধ করা ও চিত্রা-নবগঙ্গার হারানো রূপ ফিরিয়ে আনতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন, ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’-এর জেলা সভাপতি শাহ আলম। তিনি বলেন, বিল ও খেতের আশপাশের পুরোনো পুকুর, খাল-নালাগুলো নতুন করে খনন করা গেলে নদী রক্ষা পাবে। কৃষকদের আধুনিক নিয়মে পাট পচাতে উৎসাহিত করতে হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল সালাম জানান, নদী দূষণ বন্ধ করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বাঁচানো যেমন জরুরি, তেমনি দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল সোনালি আঁশ পাটকে বাঁচিয়ে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, কৃষকেরা যেন নদীতে পাট জাগ না দিয়ে বিকল্প উপায় ব্যবহার করেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পাট কাটা থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াটি যেন কৃষকদের জন্য সহজ ও ঝামেলাহীন হয়, সেই ব্যবস্থাও করা হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad