ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তা পূরণ হয়নি। বিনা বিচারে আটক, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মামলা দিয়ে হয়রানি, নারী নির্যাতন ও সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে সন্তোষজনক জবাব নেই। বাড়েনি পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা। বরং জনমনে নতুন করে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে ‘মব’। সরকার পতনের পর পদচ্যুত হয়েছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। প্রায় দেড় বছর পার হতে চললেও নতুন চেয়ারম্যান-সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
সবমিলিয়ে জনমনে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তি ফিরেনি। এমন বাস্তবতার মধ্যে বুধবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস পালন করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘হিউম্যান রাইটস: আওয়ার এভরিডে এসেনসিয়ালস’।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট নূর খান লিটন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নত হয়নি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেখানে মানুষ হতাশ হয়েছে। এখনো পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ‘মব’ করে হত্যা, চাঁদাবাজি, হেনস্তা করা হলেও এসব বন্ধে শক্তিশালী কোনো পদক্ষেপ নেই। মামলা দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হয়রানি, নিপীড়ন, নির্যাতন ও হেনস্তা করা হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভিন্নমত দমনে নির্যাতন চলছে। কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনক।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে ১৬৫ জন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ৩৫ জন, রাজনৈতিক সহিংসতায় ৯০ জন, কারাগারে বিচারাধীন ৫৫ জন ও সাজাপ্রাপ্ত ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৩৫১ জন সাংবাদিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। ৭৪ নারী ধর্ষণ ও ২১৭ জন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। খুন হয়েছে ২৮১ জন শিশু। ধর্মীয় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৬৫টি।
আসকের ২০২৪ সালের তথ্য মতে, ওই সময়ে গনপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১২৮ জন। কারাগার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে ২১ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০০ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ৬১৯০ জন। ৫৩১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২ হাজার ৪৪৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলেছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। ২০২৫ সালের ১১ মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তারা বলছে, গুম ও ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা না ঘটলেও রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণ, মাজারে হামলা ও ভাঙচুর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা বেড়েছে। বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, শ্রমিকদের ওপর হামলা, শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসময়ে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ও হত্যাসহ বেশ কিছু সামাজিক অপরাধ ঘটেছে; যা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১১৪ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৯৩ জন। গনপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৪২ জন, আহত হয়েছেন ২০৯ জন। কারাগার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে ৭৬ জন। নির্যাতনে ৮৩ জন শ্রমিক নিহত ও ৯৯৯ জন আহত হয়েছেন। ১ হাজার ৭৫৮ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৭৫ জন সাংবাদিক।
এর আগে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১ হাজার ১৮০ জন ও ৩৭ হাজার ৫১ জন আহত হয়েছেন। ৭২৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। গনপিটুনিতে ১৭৯ জন নিহত ও ৮৮ জন আহত হয়েছেন। কারাগার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে ২৫ জন। ১ হাজার ৪৯৯ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) ২০২৪ সালের তথ্যমতে, গনপিটুনিতে ১৪৬ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ১০৮ জন নিহত হয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় ৮৯ জন নিহত ও ৪ হাজার ৮৩০ জন আহত হয়েছেন। ৭১৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। ১৪৯৫ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এই সরকারের অগ্রাধিকারে নেই-এটা পরিষ্কার। মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার করা মন্তব্যে জনমনে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টাকে সিপিজে’র চিঠি
মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে লেখা এক চিঠিতে কারাবন্দি সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তর মুক্তি চেয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, চার সাংবাদিককে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার রাখা হয়েছে, যা অবিশ্বাস্য ও প্রমাণহীন। তাদেরকে আটক রাখা সাংবাদিকতা ও অনুমিত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে প্রতিশোধমূলক বলে মনে করে সিপি।


