রাজধানী ঢাকার অপরাধ জগত হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন দুই যুগ পর কারামুক্ত একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী। এই বিরোধের জেরে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।
জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে না থাকলেও পুলিশ তাদের নজরদারিতে রাখার দাবি করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি পুলিশের সেই দাবির সঙ্গে মিলছে না।
সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খুনের নেপথ্যে অন্য এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম উঠে এসেছে। আধিপত্যের এই বিরোধে টিটন খুনে তার ভগ্নিপতি সানজিদুল ইসলাম ইমন নাকি পিচ্চি হেলাল জড়িত, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ইমনের সঙ্গে হেলালের দীর্ঘদিনের পুরনো বিরোধ রয়েছে। আবার টিটনের সঙ্গে ইমনের সম্পর্ক ভালো না থাকলেও হেলালের সঙ্গে তার গোপন যোগাযোগ ছিল।
টিটন হত্যা মামলায় হেলালের পাশাপাশি কিলার বাদলের নাম আসায় গোয়েন্দা পুলিশ এর নেপথ্যে গভীর রহস্যের ইঙ্গিত পাচ্ছে। কিলার বাদলের সঙ্গে পিচ্চি হেলালের বিরোধ থাকা সত্ত্বেও তারা দুজন মিলে টিটনকে খুন করেছে বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে আন্ডারওয়ার্ল্ডে ইমনকে ঘিরে নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে।
পুলিশের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। খুনিরা কীভাবে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে এবং গোয়েন্দারা কেন আগাম তথ্য পাচ্ছে না, তা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতার অভাবেই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নজরুল ইসলাম জানান, জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ সব ধরনের অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ অত্যন্ত তৎপর। ইতিমধ্যে গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, একের পর এক শীর্ষ সন্ত্রাসী খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুটা শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নজরদারির অভাবের সুযোগটিই নিচ্ছে অপরাধীরা। তিনি মনে করেন, পুলিশ ও গোয়েন্দা তৎপরতা দ্রুত না বাড়ালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হতে পারে।
টিটন খুনের নেপথ্যে কী?
শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যাকাণ্ডের একদিন পর বুধবার দুপুরে তার ভাই সাঈদ আক্তার রিপন ঢাকার নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা করেছেন। ডিএমপির নিউমার্কেট অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মো. নাসিম জানান, অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে এবং জড়িতদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।
এজাহারে সাঈদ আক্তার উল্লেখ করেছেন, গত ২৬ এপ্রিল টিটন তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে পিচ্চি হেলাল, কিলার বাদল, শাহজাহান ও ড্যাগারি রনিদের সঙ্গে বছিলা গরুর হাটের ইজারা নিয়ে তার ঝামেলা চলছে। পরদিন টিটন তাকে জানান, সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করার জন্য তাকে ডাকা হয়েছে।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন প্রতি বছর কোরবানির পশু বিক্রির জন্য অস্থায়ী হাট ইজারা দেয়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবার বছিলাসহ ১২টি হাটের জন্য দরপত্র আহ্বান করলেও বছিলা হাটে কোনো দরপ্রস্তাব জমা পড়েনি। ফলে সেখানে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। মূলত এই হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল।
টিটন হত্যার নেপথ্যে তোফায়েল আহমেদ জোসেফ নামে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম আলোচনায় এসেছে। ২৭ বছর আগে জোসেফের ভাই টিপু মোহাম্মদপুর এলাকায় খুন হয়। ওই হত্যা মামলার আসামি ছিল টিটনসহ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। ভাই খুনের বদলা নিতে জোসেফ ভাড়াটে খুনি দিয়ে টিটনকে হত্যা করতে পারে এমন কথা চাওর হয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডে।
অন্যদিকে আত্মগোপনে থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল বুধবার রাতে এ প্রতিবেদককে জানান, নিহত টিটনের সঙ্গে তার বোন এবং বোনের স্বামী ইমনের বিরোধ ছিল। তারা দুজনই পরিকল্পিতভাবে টিটনকে হত্যার পর এখন কোরবানির পশুর হাটের ইজারার ভুয়া গল্প সাজিয়েছে।
টিটনের জন্ম ১৯৬৬ সালে যশোরের কোতোয়ালিতে। সেখানে জোড়া খুনের পর নব্বইয়ের দশকে তিনি ঢাকায় এসে অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। ভগ্নিপতি ইমনের সঙ্গে মিলে বাহিনী গড়ে তুলে তিনি পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হন। ২০০৪ সালে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০১৪ সালে একটি হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়। তবে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট তিনি কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
ছয় শীর্ষ সন্ত্রাসীর কারামুক্তি
২০০১ সালে ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই তালিকায় আব্বাস, আসলাম, হেলাল, টিটন, ইমন ও রাসুর নাম ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা সবাই জামিনে মুক্তি পান।
জামিনে মুক্ত এই সন্ত্রাসীদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ অসংখ্য মামলা রয়েছে। কোনো কোনো মামলায় তাদের সাজা হলেও অনেক মামলায় তারা উচ্চ আদালত থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। সুইডেন আসলামসহ কয়েকজনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল না করায় তারা সহজেই মুক্তি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
যেভাবে জামিন পায় সন্ত্রাসীরা
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে সাধারণ মানুষ ভয় পায়। দুর্বল সাক্ষ্য ও বাদীপক্ষের ভয়ের কারণে তারা সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আগে এসব অপরাধীদের ওপর বিশেষ নজরদারি ও প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট থাকত। তবে সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাময়িক অচলাবস্থার সুযোগে তারা কারামুক্ত হয়েছেন।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারের ভেতরে বসেই অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করতেন। বাইরে আসার পর তারা এখন আধিপত্য ও পুরনো বদলা নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা নজরদারির কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। প্রযুক্তি ও সোর্সের সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দেন তৌহিদুল হক।
গত কয়েক মাসে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। গত বছর তারিক সাঈফ মামুন নামের এক সন্ত্রাসীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়, যার নেপথ্যে টিটনের ভগ্নিপতি ইমনের নাম উঠে আসে। এছাড়া যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া এবং স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মোছাব্বির হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যেও দেশ-বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
ইমন, পিচ্চি হেলাল, সুইডেন আসলাম ও কিলার আব্বাসের মতো সন্ত্রাসীদের তৎপরতায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আন্ডারওয়ার্ল্ডেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছরই পশুর হাট ইজারা নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের প্রভাব খাটিয়ে এসব হাটের নিয়ন্ত্রণ নেয়।


