নেপালের রাসুয়া জেলায় হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যা শুরু হওয়ার ৩৮ মিনিট পর মানুষের মোবাইলে সতর্কবার্তা পৌঁছায়। ততক্ষণে ভোতেকোশি নদীর পানি ছুটে গিয়ে ঘরবাড়ি, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আঘাত হানে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে।
২৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে লেন্দে উপত্যকায় হিমবাহ ধসে বন্যার সৃষ্টি হয়। রাসুয়ার হাকুবেসি গ্রামের বাসিন্দা নিমা দর্জে তামাং তখন পরিবারের সঙ্গে ছিলেন।
হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে তিনি নিজের চেয়েও উঁচু ঢেউ নিয়ে পানি ছুটে আসতে দেখেন। তামাং ও পরিবারের সদস্যরা উঁচু জায়গায় ছুটে যান। কিন্তু স্রোতে ভেসে যান তিনি। পাথরের আঘাতে তার পা ভেঙে যায়। পরে একটি গাছ ধরে প্রায় দুই ঘণ্টা ঝুলে থেকে প্রাণে বাঁচেন। বাবা ও ভাই তাকে উদ্ধার করেন।
পরে হেলিকপ্টারে তামাংকে কাঠমান্ডু নেওয়া হয়। বর্তমানে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। তামাং বলেন, ‘বাতাস লাগলেও ব্যথা করে।’ বন্যায় চাচা, চাচি, বোন ও ভগ্নিপতিকে হারিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
কেন ৩৮ মিনিট দেরি?
হিমবাহ ধসের সময় নেপালের খনি ও ভূতত্ত্ব বিভাগ ভূকম্পন শনাক্ত করে। কম্পনের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। তবে এটিকে ভূমিকম্প হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল। পরে জানা যায়, কম্পনটি হিমবাহ ধসের কারণে হয়েছিল।
জাতীয় ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান লোক বিজয় অধিকারী বলেন, ‘কম্পনের ধরন ভূমিকম্পের সঙ্গে মিলছিল না। আমাদের বিভাগ মূলত ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ করে। তাই সাধারণ নিয়মে জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়নি।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থাও প্রথমে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড করে। পরে তথ্য সংশোধন করে।
এরপর ভোতেকোশি নদীর পানি বাড়তে থাকে। কিন্তু সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে আকস্মিক বন্যার স্রোতে সিয়াব্রুবেসি জলবিদ্যুৎ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের গেজ ভেসে যায়। ধীরে পানি বাড়া শনাক্তের জন্য তৈরি গেজ দ্রুতগতির বন্যা শনাক্তে কার্যকর ছিল না।
সকাল ৯টায় রাসুয়ার জেলা প্রশাসক বন্যার খবর জলবিদ্যুৎ ও আবহাওয়া বিভাগকে (ডিএইচএম) জানান। তথ্য পাওয়ার ১৫ মিনিট পর সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
অর্থাৎ হিমবাহ ধসের ৩৮ মিনিট পর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
তামাং জানান, তার মোবাইলে সতর্কবার্তার এসএমএস আসে সকাল ৯টা ৪২ মিনিটে। অর্থাৎ বন্যা শুরুর ৬৫ মিনিট পর।
এনডিআরআরএমএর মুখপাত্র শান্তি মাহাত বলেন, ‘বন্যায় যোগাযোগ টাওয়ারগুলো ধ্বংস হওয়ায় রাসুয়ায় তেমন কিছু করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মানুষকে সতর্ক করেছে।’
ভাটির মানুষকে সতর্ক করতে এসএমএস, কলার টিউন, গণমাধ্যমে প্রচার ও পুলিশের মাইকিং করা হয়।
আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার দুর্বলতা
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) সাবেক প্রধান নির্বাহী অনিল পোখরেল বলেন, ‘নেপালে আসলে কোনো আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেই। সেন্সর থাকলেই সেটিকে ব্যবস্থা বলা যায় না।’
তার মতে, শুধু সেন্সর বসালেই হবে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ, সতর্কবার্তা ও জরুরি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, উজানে চীনের সেন্সর ঝুঁকি শনাক্ত করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইরেন বাজানো ও মোবাইলে জোরালো সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকা উচিত।
গত এক দশকে নেপাল বিভিন্ন এলাকায় সেন্সর বসিয়েছে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পর্যবেক্ষণ এখনো সীমিত।
গত বছর একই ভোতেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যার পরও ওই এলাকায় পর্যবেক্ষণ বাড়ানো যায়নি। নেপাল সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্গমতার কারণে সেখানে নতুন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন কঠিন।
সীমান্তপারের দুর্যোগ, নেই কার্যকর সমন্বয়
লেন্দে তিব্বতের গিরং কাউন্টি থেকে নেপালে প্রবাহিত সীমান্তপারের নদী। এটি ভোতেকোশি ও পরে ত্রিশূলী নদীতে মিশেছে।
নেপাল ও ভারতের মধ্যে বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা থাকলেও চীনের সঙ্গে এ ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ২০১৯ সালে চীন ও নেপালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষায় সহযোগিতার চুক্তি হয়েছিল। সাত বছর পরও আগাম সতর্কীকরণে কার্যকর প্রোটোকল তৈরি হয়নি।
এনডিআরআরএমএর ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল বলেন, ‘কোনো প্রোটোকল নেই। এখন আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য বিনিময় করি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের দুর্যোগ জাতীয় সীমান্ত মানে না। তাই নেপাল, চীন ও ভারতের মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় ও যৌথ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জরুরি।
বাড়ছে হিমবাহ ও বন্যার ঝুঁকি
আইসিআইএমওডি নেপালে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ২১টি হিমবাহ হ্রদ শনাক্ত করেছে। দেশটিতে মোট ২ হাজার ৭০টি হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত হয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চে সংস্থাটি জানায়, ২০০০ সালের তুলনায় হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্বিগুণ হারে গলছে। ফলে হিমবাহ হ্রদ ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
আইসিআইএমওডির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ ড. শাশ্বত সান্যাল বলেন, হিন্দুকুশ অঞ্চলে একটি দুর্যোগ থেকে আরেকটি দুর্যোগ তৈরি হতে পারে। বরফধসের পর আকস্মিক বন্যা, পলি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি হতে পারে।
তিনি নেপালের উজানে আরও সেন্সর বসানোর পরামর্শ দিয়েছেন। অনিল পোখরেলও পাহাড়ের ওপর সেন্সর বসিয়ে ভূকম্পন, পাথরের গর্জন ও বন্যার শব্দ শনাক্তের কথা বলেছেন।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও ঝুঁকি
রাসুয়া ও নুয়াকোটে বন্যায় ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।
হিমাংশু ঠাক্কারের মতে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণও হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বন উজাড়, সুড়ঙ্গ নির্মাণ, বিস্ফোরণ, খনন ও বর্জ্য ফেলার কারণে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে।
ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় নির্মাণ ও পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ে ৩৬টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। তামাংয়ের হাকুবেসি গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পে কাজ করতেন।
তামাং বলেন, ‘জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে মানুষ গ্রামেই থেকে গেছে। এখন সবাই এর মধ্যে আটকে পড়েছে।’
সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আপার ত্রিশূলী-১ ও ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে ৬৩৯ জন আটকা পড়েছেন।
৩৮ মিনিটের শিক্ষা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বন্যা দেখিয়েছে বিপদ শনাক্ত করা আর মানুষকে সময়মতো সতর্ক করার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। একটি সেন্সর তথ্য দিতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সাইরেন, এসএমএস বা মাইকিংয়ের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে জীবন রক্ষা কঠিন।
সান্যাল বলেন, ‘প্রতিটি সেন্সর, সাইরেন ও মহড়ার শেষ লক্ষ্য হলো পরেরবার আরও বেশি মানুষকে নিরাপদে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া।’
হাকুবেসিতে থাকা দাদা-দাদিকে নিয়ে এখনো উদ্বিগ্ন তামাং। তারা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। তবে খাবার দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
তামাং বলেন, ‘আমাদের গ্রামে উদ্ধার ও ত্রাণ সবকিছুই অনেক দেরিতে পৌঁছায়। এখনো ১০০ থেকে ২০০ মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায় আছে।’
বন্যা শুরু হওয়ার ৩৮ মিনিট পর দেওয়া সতর্কবার্তা তাই নেপালের জন্য শুধু একটি সময়ের হিসাব নয়। এটি দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কতটা দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর হওয়া দরকার, তার বড় উদাহরণ।
[প্রতিবেদনটি নেপালের সংবাদপত্র ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর ইংরেজি লেখা অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে।]


