বাংলাদেশের হাইওয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একতলা বাসের মূল কাঠামোর (চেসিস) ওপর বেআইনিভাবে তৈরি শত শত দোতলা স্লিপার কোচ। নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে তৈরি করা এসব বাস এখন দূরপাল্লার সড়কে যাত্রীদের জন্য ‘চলন্ত মৃত্যুফাঁদ’।
আশঙ্কাজনক বিষয় হলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চোখের সামনে এসব অবৈধ যানবাহন বছরের পর বছর চলাচল করলেও তা বন্ধে সংস্থাটির তদারকি বা সদিচ্ছা দেখা যায় না।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমে সাধারণ একতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস হিসেবে বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ নেওয়া হয়। কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পরপরই গাড়িগুলো নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় বিভিন্ন ওয়ার্কশপে। সেখানে মূল বডি কেটে ফেলে সম্পূর্ণ অনুমোদনহীনভাবে ওপরের দিকে নতুন কাঠামো তৈরি করে ভারী দোতলা স্লিপার কোচে রূপান্তর করা হয়।
পরিবহন মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে এ ধরনের ৮০০ থেকে ১,০০০ বাস নিয়মিত চলাচল করছে। সরকারি সংস্থা বিআরটিসির বাসের মতো বেসরকারি খাতেও মানসম্মত দোতলা চেসিস অনুমোদনের জন্য মালিকরা বারবার আবেদন করলেও বিআরটিএ এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
চলতি মাসের শুরুর দিকে সিলেটের ওসমানীনগরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নয়জন প্রাণ হারানোর পর এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিষয়টি আবারও নতুন করে আলোচনায় আসে।
গত ৭ আগস্ট সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন যাত্রী মারা যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, প্রচণ্ড গতিতে অন্য একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর এটি সোজা গিয়ে ইউনিক পরিবহনের বাসে মুখোমুখি ধাক্কা দেয়, এতে ইউনিক বাসটি সড়ক থেকে ছিটকে পাশের ধানখেতে পড়ে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুর্ঘটনায় জড়িত বেঙ্গল পরিবহনের বাসটিও মূলত একতলা বাসের চেসিস কেটে বেআইনিভাবে দোতলা স্লিপার কোচে রূপান্তর করা হয়েছিল।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোহাম্মদ হাদীউজ্জামান জানান, অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতাই এই অনিয়মের মূল কারণ, যা যাত্রীদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘বাসমালিকরা কেবল ব্যবসায়িক লাভের কথা ভেবে যাত্রীদের জীবনের সুরক্ষা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন।’
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে বিআরটিএ। তারা জানায়, অবৈধ বাস ও এ ধরনের বডি পরিবর্তনের কাজে জড়িত ওয়ার্কশপগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হবে। অনুমোদনহীন এসব বাস জব্দ করে ডাম্পিং ইয়ার্ডে পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দেন কর্মকর্তারা। কিন্তু বাস্তবে এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত কেবল দুটি বাসের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হয়েছে।
যেভাবে একতলা বাস হয়ে ওঠে দোতলা
এই বেআইনি রূপান্তরের কৌশলটি বেশ পরিকল্পিত। প্রথমে বিদেশ থেকে ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের অশোক লেল্যান্ড একতলা চেসিস আমদানি করা হয়। বাস মালিকরা স্থানীয় ওয়ার্কশপে সাময়িকভাবে একটি একতলা বডি বানিয়ে বিআরটিএ’র পরিদর্শকদের সামনে হাজির করেন এবং সাধারণ এসি বাস হিসেবে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ বাগিয়ে নেন।
কাগজপত্র হাতে পেলেই বাসগুলো আবার ওয়ার্কশপে ফিরিয়ে এনে সাময়িক বডিটি খুলে ফেলা হয়। সেখানে বসানো হয় ভারী দোতলা স্লিপার বডি।
বিআরটিএ মেট্রো সার্কেল-২-এর উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী টাইমসের কাছে স্বীকার করেন, এসব বাসের কোনো আইনগত বৈধতা বা অনুমতি নেই।
দূরপাল্লার কোচ চলাচলে সুপরিচিত গ্রিন লাইন পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবদুস সাত্তারও স্বীকার করেন তাদের প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই এ ধরনের বাস পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের কোনো দোতলা বাসের অনুমোদন দেয়নি। আমাদের ২০টি গাড়ি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে রাস্তায় চলছে।’
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম জানান, দেশে চলমান বেশিরভাগ দোতলা বাসই একতলা চেসিসের ওপর নির্মিত এবং এগুলোর সংখ্যাি আটশ’র বেশি।
তিনি বলেন, ‘বিআরটিএ এসব তদারকি করে না, আর পুলিশও এগুলো রাস্তায় চলতে দেয় যদিও এটি তদারকি করা পুলিশেরও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এই নেতা আরও জানান, স্লিপার বাস খাতে ইতিমধ্যে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন এই ব্যবসায় আসি, তখন দেখি ৭০০ থেকে ৮০০টি এরকম বাস আগে থেকেই চলছে। আমরা আইনি সমাধানের জন্য বিআরটিএ ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। বুয়েটের একটি কমিটি গত ছয় মাস ধরে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।’
বাস-ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, মহাসড়কে চলা এসব স্লিপার বাস দূরপাল্লার যাতায়াতের জন্য কোনোভাবেই নিরাপদ বা উপযোগী নয়।
তিনি বলেন, ‘এসব বাস মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছে। আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, কিন্তু তারা এতে কান দেয়নি।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এএসএম আহমেদ খোকন বিআরটিএ’র বার্ষিক ফিটনেস পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, ‘একটি একতলা বাসকে দোতলায় রূপান্তর করার পরও তো প্রতি বছর গাড়িগুলোর ফিটনেস পরীক্ষা করাতে হয়। সেই পরীক্ষার সময় বিআরটিএ কেন এই জালিয়াতি ধরতে পারল না?’
দুর্ঘটনায় বাড়ছে আতঙ্ক
গত সোমবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেআইনিভাবে রূপান্তর করা আরেকটি দোতলা স্লিপার কোচ দুর্ঘটনার শিকার হয়।
কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী রয়্যাল কক্স পরিবহনের একটি বাস ইলিয়টগঞ্জের কাছে সামনের একটি গাড়িকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাসের সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায় এবং গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুন ধরে যায়।
তবে ভাগ্যক্রমে যাত্রীরা দ্রুত বাস থেকে নেমে যেতে পারায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
পুলিশ ও বিআরটিএ’র কাদা ছোড়াছুড়ি
মহাসড়কে কীভাবে এসব অবৈধ বাস বছরের পর বছর চলাচল করছে, তা নিয়ে হাইওয়ে পুলিশ ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ এখন একে অপরকে দোষারোপ করছে।
হাইওয়ে পুলিশ প্রধান ফারুক আহমেদ জানান, কোনো বাসের বডি পরিবর্তনের অনুমোদন আছে কি না, তা জানা পুলিশের কাজ নয়।
তিনি বলেন, ‘একটি বাসের অনুমোদন আছে কি না তা পুলিশ কীভাবে বুঝবে? গাড়িতে নম্বর প্লেট থাকলে এবং সেটি রাস্তায় চললে, তার বডি সীমা বাড়িয়ে তৈরি করা হয়েছে কি না তা দেখার দায়িত্ব বিআরটিএ’র, পুলিশের নয়।’
বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদীউজ্জামান বলেন, বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় আসা দোতলা বাসগুলোতে সঠিক প্রকৌশলগত নিরাপত্তা থাকে। কিন্তু স্থানীয় ওয়ার্কশপে অভিজ্ঞতাহীন মেকানিক দিয়ে সিঙ্গেল চেসিস কেটে রূপান্তর করলেই ভারসাম্য হারিয়ে গাড়িগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ওয়ার্কশপে সিঙ্গেল চেসিস দোতলায় রূপান্তর করাটাই মূল সমস্যা।’
বেসরকারি খাতে নিরাপদ দোতলা বাস চালানোর জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি সংস্থা বিআরটিসি ঠিকই অনুমোদন নিয়ে নিরাপদ দোতলা বাস পরিচালনা করছে।
এদিকে বিআরটিএ’র উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং-৩) কাজী মোহাম্মদ মোরসালিন জানান, তারা এ বিষয়ে একটি বৈঠক করেছেন। তবে এখনই বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কার্যক্রম শেষ হলে সব তথ্য জানানো হবে।’
বিআরটিএ’র আরেক কর্মকর্তা জানান, বেআইনি দোতলা বাসের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা ঠিক করতে বিআরটিএ ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শফিকুজ্জামান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য শফিকুজ্জামানের সঙ্গে পরপর কয়েক দিন যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


