‘সন্তানের আর্তনাদ সহ্য হয় না’

‘সন্তানের আর্তনাদ সহ্য হয় না’
উত্তরায় যুদ্ধবিমান বিদ্ধস্তের ঘটনায় হতাহতদের স্বজনের আহাজারি। ঢাকার জাতীয় বার্ন ইন্সটিটিউটে তোলা ছবি: বায়েজীদ আকতার/টাইমস
Advertisement
Advertisement

বার্ন ইউনিটের ভেতরে দগ্ধ সন্তানের আর্তনাদ, বাইরে পিতা-মাতার আহাজারি। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।

রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৪৮ জন দগ্ধকে আনা হয়েছে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে। দগ্ধদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। আর তাদের সকলের অবস্থা ‘আশঙ্কাজনক’ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

সোমবার বিকেলে দেখা যায়, সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসা স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারদিক। আইসিইউতে ভর্তি দগ্ধদের অনেকের ৩০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত শরীর পুড়ে গেছে বলে জানান চিকিৎসকরা।

বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরী বিভাগের ভেতরে চিকিৎসা চলছে ১১ বছর বয়সী চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিদ হাসান আরিয়ানের। বাইরে মেঝেতে বসে মাতম করছেন মা মনিকা আক্তার আঁখি।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বার বার বলছেন, ‘আল্লাহ, আমার সন্তানরে আমার কাছে ফিরাইয়া দেও।’

তিনি বলেন, ‘ছেলেটার সারা শরীর পুড়ে গেছে, এই যন্ত্রণা আমার সহ্য হচ্ছে না। সকাল পৌনে আটটায় সে স্কুলে গেছে। দেড়টায় তার ছুটি হওয়ার কথা ছিল, এরপর দেড়টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত তার কোচিং ছিল, সেজন্য সকালেই ছেলেরে খাবার দিয়া দিছি, এরমধ্যে এই ঘটনা ঘটল।’

স্কুলের কাছেই আরিয়ানদের বাসা, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা স্কুলে ছুটে যান। মা মনিকা আক্তার আঁখি দগ্ধ অবস্থায় পান সন্তানকে। সেখান থেকে দ্রুত তাকে নেওয়া হয় বাংলাদেশ মেডিকেলে, পরে তাকে পাঠানো হয় বার্ন ইনস্টিটিউটে।

আরও পড়ুন

দগ্ধ সন্তানের সংবাদ জানতে আইসিইউ’র বাইরে অপেক্ষা। ছবি: টাইমস

জরুরী বিভাগের সামনে এক বাবা হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘ছেলেটা সকালে মাকে বলে গিয়েছিল- স্কুল থেকে ফেরার পথে আইসক্রিম নিয়ে আসবে। এখন শুধু ওর পোড়া মুখটাই দেখছি। আমরা শুধু চাই, ও বাঁচুক।’

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া শায়ানের শরীরের বেশিরভাগ পুড়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন তার ফুপু রুবিনা আক্তার। উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা রুবিনা বলেন, ‘সকালে সুস্থ ছেলেটা বাসা থেকে বের হইলো, আর এখন হাসপাতালে।’

তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদ হাসানের মা ঝর্না আক্তার জরুরী বিভাগের সামনে বসে কাঁদছেন। তার ছেলেকে আইসিউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আর একটু পরেই ছুটি হইলে, ছেলে বাসায় চলে যাইতো। আর এখন ছেলে আইসিইউতে।’

জরুরী বিভাগের সামনে থাকা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইয়ুম খান বলেন, ‘জুনিয়রদের শিফটটা সকাল থেকে শুরু হয়। ঘটনার সময় আমরা ক্লাসে ছিলাম। তারপর বিকট শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি, স্কুলে আগুন জ্বলছে, অবস্থা খারাপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার কাজ শুরু করে, তারপর ফায়ার সার্ভিস আসে।’

‘এক আন্টি বলে, বাবা আমার মেয়েকে একটু ধরো, তার দুই হাত পুড়ে গেছে। পরে ঐ ছাত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি।’

হাসপাতালে ভর্তি দগ্ধদের তালিকা। ছবি: টাইমস

বার্ন ইন্সটিটিউট থেকে পাওয়া তথ্যমতে, হাসপাতালে ভর্তি দগ্ধদের বয়স ৯ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে আশরাফুল ইসলামের শরীরের ১৫ ভাগ, রোহানের ৫০ ভাগ, শ্রেয়ার ৫ ভাগ, কাব্যের ২০ ভাগ, চাঁন মিয়ার ৪০ ভাগ, ইউশার ৬ ভাগ, মেহেরিনের ৪ ভাগ, রুপি বড়ুয়ার ৬ ভাগ, তাসমিয়ায় ৫ ভাগ, ইমন (জানা যায়নি), জয়নার ৮ ভাগ, সায়েবার ৮ ভাগ, পায়েলের ১০ ভাগ, কাফির ১০ ভাগ, মুনসুরার ৫ ভাগ, আলভিনার ৫ ভাগ, নিলয়ের ১৫ ভাগ, মাসুমের ৬০ ভাগ, আয়েনের ৬০ ভাগ, মাহতাবের ৪০ ভাগ, আরিয়ানের ৫৫ ভাগ, মকিনের ৬২ ভাগ, আবিরের ৯০ ভাগ, আনিজনের ১০০ ভাগ, নাজিয়ায় ৮০ ভাগ, মেহেরিন চৌধুরির শরীরের ১০০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে।

এছাড়াও হাসপাতালের আইসিইউতে আছে নাফিস, শামীম, শায়ান ইউসুফ, মাহিয়া, আফনান, ফাইয়াজ ও সামিয়া নামের ৭ শিক্ষার্থী। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা যায়।

সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ৫০ জনকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। তারা সবাই গুরুতর দগ্ধ বলে জানা গেছে। এছাড়া বহু দগ্ধ ও আহত শিক্ষার্থীকে উত্তরা এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইএসপিআর।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
আরেফিন তানজীব
আরেফিন তানজীব

Staff Reporter, Times of Bangladesh

সম্পর্কিত খবর