রাজধানীতে বেসরকারি হাসপাতালে একজন শিক্ষানবিস এমবিবিএস চিকিৎসক চাকরির শুরুতে মাসে বেতন পান ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। ঢাকার বাইরে এই অঙ্ক ১৫ হাজার টাকায় নেমে আসে। অথচ সরকারের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সব মিলিয়ে মাসে পাবেন ৩৩ হাজার টাকার বেশি।
২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করার পর থেকেই সরকারি-বেসরকারি দুই খাতের আয়ের ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ শুরু হয়। বেসরকারি খাতের বড় অংশেই নির্দিষ্ট কোনো সর্বনিম্ন মজুরি কাঠামো নেই। তার ওপর রয়েছে বছরের পর বছর বেতন না বাড়ার ক্ষোভ। এই অবস্থায় নতুন পে-স্কেল বেসরকারি কর্মীদের হতাশ করার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের উদ্দীপনা কমিয়ে দেবে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশীদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আর্থিক চাপ সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে তুষ্ট করতে বেতন বাড়ানো হয়েছে। এতে বেসরকারি খাতের ওপরও বেতন বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হবে, যা সামলানোর সক্ষমতা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই। ফলে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’
২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেলের পর সরকার জানিয়েছিল, ভবিষ্যতে আর কোনো পে-কমিশন হবে না। বরং ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতির মাধ্যমে বেতন সমন্বয় হবে। অথচ এক দশকের মাথায় সেই অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হলো।
মূল্যস্ফীতির দোহাই দিয়ে বেতন বাড়ানো হলেও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। গত ১১ বছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৮২ শতাংশের কিছু বেশি। আর ইনক্রিমেন্ট ও ভাতাসহ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ।
২০১০ সালের পর থেকে ঘোষিত তিনটি পে-স্কেলে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারী, সশস্ত্র বাহিনী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী। বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে ও গতিশীলতা আসবে–সরকারের এই যুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের সংশয় রয়েছে।
সরকারের ঘোষণা কী ছিল?
২০১৫ সালে ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন পে-কমিশন বেতন দ্বিগুণ করা, ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং নতুন পে-কমিশন বন্ধের সুপারিশ করেছিল। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও ১০ ও ১৬ বছর চাকরি শেষে পদোন্নতির কথা জানান।
তবে সাবেক অর্থ সচিব মুসলিম চৌধুরী টাইমসকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন সমন্বয়ের কথা বলা হলেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়নি। তাই নতুন পে-কমিশন না করার ঘোষণার কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না।’
বেতন কি অতিরিক্ত বেড়েছে?
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেতন বেশি বেড়েছে। তার মতে, ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধিই যুক্তিসংগত হতো।
২০১৫ সালের পর মূল্যস্ফীতি ৮২ দশমিক ২৫ শতাংশ হলেও নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি এবং আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া অতিরিক্ত প্রণোদনার কারণে সরকারি কর্মচারীরা মূল্যস্ফীতির চাপে পিছিয়ে পড়েননি।
নতুন কাঠামোয় ১৯ ও ২০তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ, ১২ থেকে ১৮তম গ্রেডে ১১৫ থেকে ১৩৯ শতাংশ এবং ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ছে।
নতুন বৈষম্য?
২০১০ সালে অন্তত ৭০ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৯৫ শতাংশ এবং এবার ১০০ শতাংশ বেতন বাড়ায় ২০১০ সালের ১০ হাজার টাকা মূল বেতন পাওয়া কর্মচারীর আয় নতুন কাঠামোয় দাঁড়াবে ৬৬ হাজার টাকার ওপরে।
নতুন স্কেলে ১ম শ্রেণির কর্মকর্তার প্রারম্ভিক মোট আয় হবে ৭০ হাজার টাকার বেশি এবং ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর আয় হবে ৩৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা।
বিপরীতে, দেশের ৬০ থেকে ৭০ লাখ বেসরকারি কর্মচারীর মধ্যে কেবল ব্যাংকিং খাতের সর্বনিম্ন বেতন বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ‘এ’ ক্যাটাগরির কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও এনজিও ছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি সংস্থায় শিক্ষানবিসদের শুরুর বেতন হতাশাজনক।
ছোট প্রতিষ্ঠানে তা ৩০ হাজার এবং অপেক্ষাকৃত ভালো সংস্থায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এমনকি সংবাদপত্রের ওয়েজ বোর্ডও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে মানা হয় না। পোশাক খাতে সর্বনিম্ন মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা হলেও গৃহকর্মী বা পরিবহন শ্রমিকদের মজুরির কোনো কাঠামোই নেই।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘খাতগুলোর বৈষম্য আরও বাড়বে। বেতন বাড়ানোর চাপে পড়বে বেসরকারি খাতও।’
ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনে প্রভাব
কাজের সুযোগ ও সুষম মজুরির অভাবে যুবসমাজ ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম-এর ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৯টি অবৈধ রুটে অন্তত ১ হাজার ৩২৯ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন এবং ৮৫৯ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
অর্থসংস্থান ও দুর্নীতির প্রশ্ন
নতুন স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে বছরে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি, আর বাজেটে প্রতি বছর অতিরিক্ত লাগবে ১০ হাজার কোটি টাকা। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ৮৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৩৯ শতাংশ। এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিচ্ছে সরকার, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে ব্যাহত করছে।
বেতন বাড়ালে দুর্নীতি কমবে–সরকারের এমন দাবি খারিজ করে অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘এটি একটি অবাস্তব প্রত্যাশা। দুর্নীতি ঘটে অভাবের মানসিকতা, ক্ষমতার সুযোগ এবং কাজের স্বপক্ষে যুক্তির কারণে। অডিট, জবাবদিহিতা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার না করলে কেবল বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি রোখা সম্ভব নয়।’


