নানা চড়াই-উৎরাই আর দুঃস্বপ্নের প্রায় দুই দশক পেরিয়ে আবারও বাংলাদেশের আগামী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরই মধ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পেয়েছে তারা। ফলাফলের প্রবণতা অনুসারে দুই-তৃতীয়াংশ আসনেও জয় পেতে পারে অতীতে চার বার ক্ষমতায় থাকা এই দল।
নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলের প্রধানকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন রাষ্ট্রপতি। এরপরই শপথ গ্রহণ করবে নতুন সরকার।
বিএনপি সরকারে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন এই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে বাবা-মায়ের পর সন্তান হিসাবে সরকার প্রধান হবেন তিনি। তার আগে বাবা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও মা খালেদা জিয়া তিন দফা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অবশ্য তাঁর দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ ছিল সংক্ষিপ্ত।
এর আগে ১৯৭৫ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসেন তখনকার সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সে অবস্থাতেই পদোন্নতি নিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। প্রথমে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের অধীনে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন, পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালেই গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করেন জিয়াউর রহমান।
১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। তখনকার সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইম এম এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারায় বিএনপি। এরপর গৃহিনী থেকে দলের হাল ধরেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৯০ সালে এক গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
প্রথমবার প্রায় পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থেকে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তবে সেই সরকারের মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক মাস। পরে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০৬ সালের অক্টোবরে সেই সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন খালেদা জিয়া। এর কিছুদিন পরেই ক্ষমতা নেয় সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তকণ থেকেই শুরু হয় বিএনপির দুর্দশা। গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া সহ দলের প্রায় সকল শীর্ষ নেতা। গ্রেপ্তারের পর অমানুষিক নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়তে বাধ্য হন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান। তখন থেকে লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন তিনি।
পরের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপির দুর্দশা আরও গভীর হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় বিএনপির ওপর চলে নিপীড়ন-নির্যাতন। এক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে আবারও কারাগারে যান খালেদা জিয়া। তখন থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান।
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিএনপি। গত বছর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন তারেক রহমান। এর মাত্র পাঁচদিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার মা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গত ১৮ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়।


