জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তার এই যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়েছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। আর তাদের এসব সমাবেশ ও বিক্ষোভের কারণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশটিতে বসবাসকারী অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বিরোধ বিদেশের মাটিতে টেনে আনা, বিক্ষোভ-সমাবেশ করে জনজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করেন প্রবাসীরা। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কার কথাও উঠে আসছে।
বাংলাদেশিদের এসব কর্মকাণ্ড সবশেষ আলোচনায় আসে গত ২৫ আগস্ট। সেদিন গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কনস্যুলেটে মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
ভেতরে যখন অনুষ্ঠান চলছে, তখন বাইরে অবস্থান নেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশ; যারা মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থক, নেতাকর্মী। তারা সরকারবিরোধী নানা স্লোগান দেন, কনস্যুলেট অফিসের দরজা ভাঙচুর করেন এবং অতিথিদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে এবং কয়েকজনকে আটক করে।

এরই মধ্যে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় পুলিশ, মেয়র এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় নিউইয়র্কের জ্যামাইকা প্রবাসী নাঈম ভূঁইয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদরা যদি বিতর্কিত কাজ করেন এবং দেশের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে তা বাংলাদেশি কমিউনিটির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্য দেশের, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও তখন আমাদের নিয়ে বিদ্রুপ করে।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকদের প্রতিবাদের ভাষা ‘সভ্য’ নয় বলে মনে করেন ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত হুমায়ুন কবির আকাশ।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদের একটি সভ্য ভাষা থাকা উচিত। আমাদের রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশি কনস্যুলেট অফিস পর্যন্ত ভাঙচুর করেছে। এর মাধ্যমে অন্য কিছু হোক বা না হোক, দেশের ভাবমূর্তি ঠিকই নষ্ট হয়েছে।’
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে তার নিউ ইয়র্কের আবাসস্থলের সামনে অবরোধের ‘শান্তিপূর্ণ’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ।
রোববার যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে পৌঁছলে তাকে কালো পতাকা প্রদর্শন করবে। এরপর প্রধান উপদেষ্টার আবাসস্থল গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে, প্রদর্শন করা হবে মব সন্ত্রাসে নিহত ও নির্যাতনের শিকার তরুণ প্রজন্মের কাহিনি।
এমনকি শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টা যখন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেবেন সেদিন সংস্থাটির সদর দপ্তরের সামনেও করা হবে বিক্ষোভ-সমাবেশ।
এসব কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে বসবাসরত আওয়ামী লীগ, মহিলালীগ, সেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, হাসিনা মঞ্চসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ প্রবাসী সব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অংশ নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, তার সফরসঙ্গী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সবাইকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি। তাদের স্বাগত জানিয়ে স্থানীয় সময় শনিবার নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে মিছিল ও সমাবেশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীরা।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য গিয়াস আহমেদ জানান, সোমবার প্রধান উপদেষ্টাসহ তার সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানাতে জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন তারাও।
তিনি বলেন, ‘সেখানে তাদেরকে লাল গালিচা দিয়ে আমরা বরণ করব। জাতিসংঘে যে অধিবেশন হবে সেখানেও আমরা অংশগ্রহণ করব।’
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে তাদের আন্দোলনের ফসল উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা আমরা একযোগে কাজ করেছি ফ্যাসিবাদ পতনের জন্য। অতএব এই সরকার আমাদের সরকার। এই সরকারের প্রধান ড. ইউনূস এবং আমাদের বিএনপির সংগ্রামী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য নেতৃবৃন্দরা আসছেন। অবশ্যই তাদের আমরা সাধুবাদ জানাব।’
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি এসব কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে এক প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, ‘আজ বিএনপি বড় সমাবেশ করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মোহাম্মদ ইউনূসকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এসব ঘটনা যদি চলতে থাকে, তবে আমেরিকার প্রশাসন আমাদের উপর বিরূপ পদক্ষেপ নিতে পারে। যা আমাদের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।’
মুহাম্মদ ইউনূসের সফর ঘিরে এতসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাড়তি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও নিউইয়র্ক পুলিশকে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠিয়েছি। আশা করি, তারা আমাদের সহায়তা করবেন।’
প্রধান উপদেষ্টার এই সফর ঘিরে যেন কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, দেশের ভাবমূর্তি যে ক্ষুণ্ন না হয়; সেটাই এখন চাওয়া বেশিরভাগ প্রবাসী বাংলাদেশির।


