বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম মুলপি পাড়ার পাহাড়ে সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘কুকিচিন ন্যাশনাল আর্মি’র (কেএনএ) মধ্যে এক বন্দুকযুদ্ধে বৃহস্পতিবার ভোররাতে কেএনএ’র মেজর পদবিধারী একজন কমান্ডারসহ দুই জন নিহত হয়েছে।
এই অভিযানে সেনাবাহিনী ৩টি অত্যাধুনিক এসএমজি, ১টি চাইনিজ রাইফেল, ৮টি ম্যাগাজিন, ৯ দশমিক ৯৬ মিমি. বল এ্যামো ১৫৪ রাউন্ড, ৩৯ মিমি. এ্যামো ২৩৭ রাউন্ড, ৫৪ মি. এ্যামো ৬০ রাউন্ড, ৩ সেট ইউনিফর্ম, ৮টি স্মার্ট ফোন, ৭টি বাইবেল, ওয়ারলেস সেটসহ সামরিক সরঞ্জামাদি উদ্ধার করে। অভিযানে বেশকিছু প্রামাণ্য দলিলপত্রও উদ্ধার করেছে সেনা সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার সকালে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) অভিযান সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য নিশ্চিত করে। পরে এ দিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রুমা জোন অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল আলমগীর হোসেন আনুষ্ঠানিক এক ব্রিফিং এ সাংবাদিকদের কাছে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তবে ঘটনার ১৫-১৬ ঘন্টা পরও নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত কোন তথ্য দেয়া হয়নি।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নিহত কমান্ডারের নাম মেজর পুতিন (লাল মিন সাং) হতে পারে। তবে নিশ্চিত করে কেউ তার পরিচয় জানাতে পারেনি। ব্রিফিং এ বলা হয়, এখনো অভিযান চলমান রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, গোপন তথ্যে নিশ্চিত হয়ে রুমা জোন থেকে সেনাবাহিনীর ৩টি বিশেষ গ্রুপ বুধবার মধ্য রাত থেকে রেমাক্রি-প্রাংশা, মুলপি ও আশপাশের এলাকাগুলোতে অভিযান শুরু করে। অভিযান টের পেয়ে কেএনএ সদস্যরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে এসময় সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি ছুড়ে। এক পর্যায়ে কেএনএ সদস্যরা তাদের অবস্থান থেকে পালিয়ে যায়। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে দু’জনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পাওয়া যায়। সবশেষ, মরদেহ দু’টি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে জেলা হাসাপাতালের মর্গে।
চট্রগ্রামেও সক্রিয় কেএনএ- ইউপিডিএফ
কেএনএ-র ইউনিফর্ম উদ্ধারের ঘটনায় সোমবারই চট্টগ্রাম সদরের বায়েজিদ বোস্তামি থানার জালালাবাদ কুলগাঁও এলাকা থেকে সুজন বড়ুয়া ওরফে সাইমন (২৯) নামে এক ব্যাক্তিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
তারা জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত সুজন পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ক্যাডার। তার বাড়ি খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি থানার সাঁওতাল পাড়ায়, বাবার নাম অশোক বড়ুয়া।
র্যাব সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে উদ্ধার হওয়া কেএনএ-র ইউনিফর্ম জব্দের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার পলাতক আসামি সুজন।
তবে ইউপিডিএফ মুখপাত্র অংগ্য মারমা দাবি করেছেন, তার দলের কর্মী সুজন বড়ুয়া কোন সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত নন।
এক প্রতিবাদ পত্রে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সন্ত্রাসী রূপে সাজানোর জন্য সামরিক পোশাক পরিয়ে ও হাতে অস্ত্র গুঁজে দিয়ে ছবি তুলে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে বায়েজিদ থানায় হস্তান্তর করেছে।’
পাহাড়ে সেনা অভিযান
বৃহস্পতিবার ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মিলিটারি অপারেশনস ডাইরেক্টরেটের কর্নেল স্টাফ কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে। তিনি আরও জানান, সম্প্রতি পরিচালিত অভিযানে অভিযুক্ত ২৩ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানের সময় এক সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
কর্নেল শফিকুল বলেন, ‘সেনাবাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছে।’

যেভাবে কেএনএ’র উত্থান
পাহাড়ের সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের সাবেক শিক্ষার্থী নাথান বম পাহাড়ের ৯টি উপজেলা নিয়ে স্বাধীন কুকি রাজ্য প্রতিষ্ঠায় ২০২২ সালে সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করেন। প্রথমে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)’ নামক আঞ্চলিক দল, পরে খোলা হয় এর সামরিক বিভাগ কেএনএ। তখন থেকে অনেকটা প্রকাশ্যেই তারা ফেসবুক ও ইউটিউবে সশস্ত্র তৎপরতা প্রচার করছিল।
এর দু’বছর পর সরকারের সঙ্গে ‘শান্তি সংলাপ’ চলার সময়ে ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল হঠাৎ রুমায় ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্রশস্ত্র লুট করে কেএনএ-র সদস্যরা পিছু হটে। তাদের বিরুদ্ধে ইসলামী জঙ্গিগ্রুপগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।
রুমায় ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় কেএনএ-র তৎপরতা। তবে আগেই সীমান্ত পেরিয়ে এর গেরিলা সদস্যদের অধিকাংশই আশ্রয় নিয়েছে ওপারে, মিজোরাম হয়ে মনিপুরে।
সে সময় নিরাপত্তা অভিযানে ‘গণগ্রেপ্তার’ এড়াতে অন্ততঃ তিন হাজার জুম চাষি বম নারী-পুরুষ গ্রাম ছাড়া হন বলে টাইমস অব বাংলাদেশের খবরে প্রকাশ। সে সময় জনমানবহীন হয়ে পড়ে ছয়টি পাহাড়ি গ্রাম। অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ২৮ জন পাহাড়ির মধ্যে নারী-পুরুষ ও শিশু রয়েছেন, তাদের মধ্যে দু’জন কারা হেফাজতে মারা গেছেন।
সবশেষ, বৃহস্পতিবার সেনা সদর দপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ১৩৮ জন পাহাড়ি নিজেদের এলাকায় ফিরে এসেছেন।


