নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৫৭ জন মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৪০৩ জন, যাদের অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক বলে জানা গেছে।
বুধবার দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় আকস্মিক এ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়ায় ১ জন, নুয়াকোটে ১১, ধাদিংয়ে ১৮, চিতওয়ানে ৩৩, গোর্খায় ১৯, তানাহুঁতে ৭ এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্যমতে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে ভারতের ১৩৩, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজদের মধ্যে ২৬টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া ৬১ জন নেপালি নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।
ট্যুর অপারেটরদের বরাত দিয়ে পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।
রাজু ভাদেল (৫৬) নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘বুধবার সকালে আমার ভগ্নিপতি আমাকে ফোন করেছিলেন। তারা কাঁদছিলেন এবং বলছিলেন যে তাদের পুরো বাড়িটি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা গেলেও তার ভাই এখনো নিখোঁজ।’
নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, নদীর তীব্র স্রোতে বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে কাদার নিচে তলিয়ে যাওয়া একটি বাড়ির কেবল ওপরের অংশ দেখা গেছে।
দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশের এক মুখপাত্র এএফপিকে জানান, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উপদ্রুত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, এই আকস্মিক বন্যায় তিব্বতের গিরংয়ে ৩ জন মারা গেছেন এবং নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৬৫ জন। নেপাল সীমান্তের তিব্বত বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ‘ব্যাপক হতাহতের’ ঘটনা ঘটেছে বলে সিসিটিভি উল্লেখ করেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন।
২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর এটিকে নেপালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে। বন্যায় ঠিক কী কারণে এমন আকস্মিক রূপ নিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, বুধবার তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্পের পর এর সূত্রপাত হয়।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টে বলেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি হয়। এর ৩ মিনিট পর, অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে বিষয়টি আরও যাচাই করে দেখতে হবে বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) বিশেষজ্ঞ চিয়াংগং ঝাং এএফপিকে জানান, নেপাল-চীন সীমান্ত নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে আছে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।
দুর্যোগে শোক প্রকাশ করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত। উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সরকার কোনো বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিক সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে।


