নওগাঁর খোলা বাজারে সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম প্রতিরোধ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৎপর জেলা প্রশাসন। উপজেলা কৃষি অফিসারের প্রসিকিউশনে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন নওগাঁ কর্তৃক প্রতিনিয়তই জেলার ১১টি উপজেলায় সার সংক্রান্ত যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলমান রয়েছে।
অভিযান পরিচালনার সময় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা পেলেই জরিমানা করার পাশাপাশি মামলা দায়েরের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতিটি সার ডিলার ও খুচরা সার ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেওয়াসহ কঠোর সতর্কতার মাধ্যমে হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। জেলাজুড়ে সার নিয়ে যে কোনো অনিয়মের সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে এমন অভিযান নিয়মিত চলমান রাখার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে ধান চাষে প্রসিদ্ধ উপজেলা হচ্ছে রাণীনগর। সেই রাণীনগর উপজেলাজুড়ে সঠিক ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যমূল্যে কৃষকদের মাঝে সার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এবং অবৈধ সার মজুতদারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি অফিস। গত আগস্ট মাসজুড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সারের দোকান ও গুদামে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। গত আগস্ট মাসের ১১ তারিখে উপজেলার আবাদপুকুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মেসার্স আলম ট্রেডার্সকে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ছয় হাজার টাকা, মেসার্স রাকিব ট্রেডার্সকে আট হাজার ও মেসার্স মুন্না ট্রেডার্সকে এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ১৮ তারিখে উপজেলার আবাদপুকুর এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে মেসার্স শহিদুল ইসলামকে ১২ হাজার টাকা ও একডালা এলাকার মেসার্স সুধীর ট্রেডার্সে অভিযান চালিয়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গত মাসের ২১ তারিখে উপজেলার রাণীনগর বাজার এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে মেসার্স শাহী ট্রেডার্সকে চার হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই মাসের ২৪ তারিখে উপজেলার আবাদপুকুর এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে মেসার্স ফকির ট্রেডার্সকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান। এ ছাড়া উপজেলাজুড়ে এমন অভিযান চলমান রয়েছে এবং আগামীতেও এসব অভিযান চলবে বলেও জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, চলতি আমন মৌসুমে জেলার ১১টি উপজেলার এক লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি কৃষকের জন্য সারের প্রয়োজন মাফিক সুষম বন্টন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই অগ্রিম বরাদ্দের সার খোলা বাজারে বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের ফসলের জমি বিবেচনা সাপেক্ষে কতটুকু সার প্রয়োজন, সেইটুকু সার ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যাচাই সাপেক্ষে সুপারিশের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় মোবাইল কোর্ট অব্যাহত থাকার কারণে সার নিয়ে কোনো অরাজকতা সৃষ্টির সুযোগ নেই বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান জেলার যে কোনো স্থানে সার বিতরণে সঠিক ব্যবস্থপনার ত্রুটি হলেই এবং সারের অবৈধ মজুতের সন্ধান পেলেই সেখানে হানা দেওয়ার জন্য উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট টিমকে সব সময়ের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অভিযানকালে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর আওতায় বিনির্দেশ বহির্ভূত সার গুদামজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিক্রয়, বিপণন, পরিবহন ও বিতরণ, ধার্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে সার বিক্রি করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গত আগস্ট মাসে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সার সংক্রান্ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১৮টি মামলায় মোট দুই লাখ ১৬ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযান চালিয়ে জেলার আত্রাই উপজেলায় ছয়টি, রাণীনগর উপজেলায় ছয়টি, মহাদেবপুর উপজেলায় একটি, মান্দা উপজেলায় দুটি ও বদলগাছি উপজেলায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখনও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ ছাড়া গত শনিবার জেলার মহাদেবপুর উপজেলার চান্দাশ ইউনিয়নের বাগডোব নামক স্থানে খুচরা সার বিক্রেতার বিরুদ্ধে অধিক মূল্যে ডিএপি সার বিক্রির অভিযোগ আসে উপজেলা প্রশাসনের কাছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় অভিযুক্ত ব্যক্তির দোকানে মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করে ভোক্তা অধিকার আইনে ওই ব্যবসায়ীর ১৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয়। পাশাপাশি দোকানে থাকা অবশিষ্ট সারের বস্তা সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরবর্তীতে মোবাইল কোর্ট টিম উপজেলার কুঞ্জবনে অবস্থিত একটি ডিলারের দোকান পরিদর্শন করে কৃষকদের কাছে সঠিক মূল্যে ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় সার বিতরণ করার বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়।
জেলা প্রশাসক আরও জানান চলতি আমন মৌসুমজুড়ে এবং কৃষি প্রধান জেলা হিসেবে সারা বছরই নওগাঁর ১১টি উপজেলায় সার বিষয়ে যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের এমন তৎপরতা অব্যাহত রাখা হবে। জেলার সব উপজেলাতে সুষ্ঠু সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি প্রতিরোধ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপজেলা কৃষি অফিসারের সহযোগে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং তা অব্যাহত রাখার কথা জানান জেলার এই প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা।


