যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাকে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এক দিনেই সূচকটির বাজারমূল্য নেমে গেছে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে নতুন উদ্বেগের মধ্যে বৃহস্পতিবার এই দরপতন ঘটে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার নাসডাক কম্পোজিট সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণার পর এটিই সূচকটির সবচেয়ে বড় এক দিনের পতন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বড় জয়ের পর এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা বাড়তে পারে এবং নতুন প্রকল্প অনুমোদন কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
গত ৬ অক্টোবর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর নাসডাক কম্পোজিট প্রায় ১২ শতাংশ হারিয়েছে। ফলে সূচকটি এখন সংশোধন পর্যায়ে (কারেকশন) প্রবেশ করেছে। সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কোনো সূচক বা শেয়ারের দর ১০ শতাংশ কমলে তাকে কারেকশন বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জোনসট্রেডিংয়ের প্রধান বাজার কৌশলবিদ মাইকেল ও’রুর্ক বলেন, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়, বিশেষ করে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদে তাদের সাফল্যের পর ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি কমে যাওয়ার বিষয়টি বাজারের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে আগে ব্যাপক উত্থানের পর এখন বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আয় ও বিনিয়োগের বিপরীতে সম্ভাব্য মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। উচ্চ সুদের হার এবং কঠোর আর্থিক পরিস্থিতির কারণে ছোট প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে চিপ নির্মাতা ও এআই অবকাঠামোভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে। ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক ১২ শতাংশ কমে ছয় মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে। এনভিডিয়ার শেয়ারের দর কমেছে ৯ শতাংশ এবং অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেসের (এএমডি) কমেছে ১৭ শতাংশ।
এদিকে নাসডাক-১০০ সূচক ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত এই সূচকের দরপতনে এক দিনেই ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। অ্যামাজন ও অ্যালফাবেটের শেয়ারদর কমেছে ২ দশমিক ২ শতাংশ করে। মাইক্রোসফটের দর কমেছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাজারের অস্থিরতা পরিমাপের সূচক ভিআইএক্সও বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর এক দিনে সূচকটির এটিই সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি।
ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধিতাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এসব স্থাপনা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করে। ফলে স্থানীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও পানির সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের গ্রানাইট ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রুস জারো বলেন, আবাসিক এলাকার কাছাকাছি ডেটা সেন্টার নির্মাণ, বিদ্যুৎ গ্রিড ও পানির ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক বিরোধিতা দেখা দিতে পারে। অনেক প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদন পেলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রকল্পের অনুমোদন এখনো বাকি।
ইউবিএসের বিশ্লেষকদের অনুমান, ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের যে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার কথা, তার প্রায় ৩০ শতাংশ নির্মাণকাজ স্থগিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে দ্রুত অবকাঠামো সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল এআই শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এআই খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের বিপরীতে কতটা মুনাফা আসবে, তা নিয়েও আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এআই অবকাঠামোভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোরউইভের শেয়ারের দর বৃহস্পতিবার ১০ শতাংশ কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির ঋণখেলাপির ঝুঁকি পরিমাপের পাঁচ বছর মেয়াদি ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপের (সিডিএস) স্প্রেড বেড়ে রেকর্ড ১ হাজার ২৬৭ দশমিক ৯ বেসিস পয়েন্টে পৌঁছেছে। আরেক প্রতিষ্ঠান নেবিয়াসের শেয়ারের দর কমেছে ১৫ শতাংশ। গত ৬ অক্টোবর নাসডাকের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর এই দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর অর্ধেক বা তার বেশি কমেছে।
ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী অ্যাপ্লায়েড ডিজিটাল, সাইফার ডিজিটাল ও আইরেনের শেয়ারের দর ১৪ শতাংশের বেশি কমেছে। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ ও সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জিই ভার্নোভার দর কমেছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কনস্টেলেশন এনার্জির ২ দশমিক ৫ শতাংশ।


