তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বুধবার প্রথম সভায় বসেছে নিম্নতম মজুরি বোর্ড। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং সাম্প্রতিক শ্রম অসন্তোষের মধ্যে এই সভাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের ৪ নভেম্বর জারি করা সভার নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯ ধারা অনুযায়ী গার্মেন্টস শিল্পে নিযুক্ত সব শ্রেণির শ্রমিক ও কর্মচারীর নিম্নতম মজুরি হারের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য এ সভা আহ্বান করা হয়েছে।
বেলা ১১টায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সভাকক্ষে সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র জেলা জজ শেখ আশফাকুর রহমান এতে সভাপতিত্ব করবেন। সভার আলোচ্যসূচিতে রয়েছে সদস্যদের পরিচয়পর্ব, গার্মেন্টস শ্রমিক ও কর্মচারীদের নিম্নতম মজুরি হারের সুপারিশ প্রণয়ন এবং বিবিধ বিষয়।
গত ১ নভেম্বর সরকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য ছয় সদস্যের এই বোর্ড গঠন করে। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শেখ আশফাকুর রহমান। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
এর আগে গত ১ নভেম্বর বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা দ্রুত প্রথম সভা আহ্বানের দাবি জানান। তাদের বক্তব্য ছিল, দ্রুত কার্যক্রম শুরু করে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ চূড়ান্ত করতে হবে, যাতে জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা নতুন মজুরি পান। প্রয়োজনে ধারাবাহিক বৈঠক করে দ্রুত কাজ শেষ করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছিলেন শ্রমিক প্রতিনিধিরা।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের জন্য মাসিক ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়। এর আগে ২০১৮ সালে পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ছিল ৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ ২০২৩ সালের কাঠামোয় নিম্নতম মজুরি ৪ হাজার ৫০০ টাকা বা ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল।
এবার শ্রমিকদের একটি বড় দাবি হলো মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরি দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। এ দাবিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন ধরে চলা শ্রম অসন্তোষে বেশ কিছু কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে। ২০২৬ সালে শ্রম আইনে সংশোধনের মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। ফলে সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া পোশাকশ্রমিকদের মজুরি কাঠামোর পর নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি এবার সামনে এসেছে।
নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয়, শিল্পের সক্ষমতা এবং মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বোর্ডের প্রথম সভার মধ্য দিয়ে এসব বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও সুপারিশ তৈরির কাজ শুরু হবে।


