আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ও অচেনা এক পৃথিবী

আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ও অচেনা এক পৃথিবী
নজীবুর রহমান। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
Advertisement
Advertisement

সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামোগত অগ্রগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি হলো মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা, সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। যখন মানুষ ব্যক্তিস্বার্থকে সামাজিক কল্যাণের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পায়, ক্ষমতাবানদের অনৈতিকতা উপেক্ষা করে এবং সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজে মূল্যবোধের সংকট তৈরি হয়।

আমাদের সমাজে গর্ব করার মতো এমন মূল্যবোধ ছিল, যা সমাজের মধ্যে সংহতি লক্ষ্য করা যেতো। একটা সময় ছিল অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ দূর থেকে যখন ভেসে আসতো, চারিদিকে সকল যানবাহন ওই অ্যাম্বুলেন্সকে সাইড দিয়ে দেয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তো, এরকম চিত্র তখন হরহামেশাই দেখা যেতো। এখনকার ছেলেমেয়েদের বললে হয়ত কল্প কাহিনি মনে করবে। তখন রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স বলি কিংবা ফায়ারসার্ভিসের কথাই বলি; এসব যানবাহনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেই অন্যান্য যানবাহন হতে শুরু করে মানুষজনের মধ্যেও একধরনের উৎকন্ঠা বিরাজ করতো। লোকজনও রাস্তা পারাপারে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ারসার্ভিসের গাড়িগুলোকে জ্যাম এড়িয়ে চলার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। কিংবা যানবাহনে কোথাও তরুণরা মরুব্বিদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে, তাদের জন্য সিট ছেড়ে দিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থাকতো।

আশির দশকের কথা, তখন স্কুলে পড়ি। সেসময় আমাদের সমাজে পারস্পরিক সম্মানবোধ প্রবল  ছিল। স্কুল বলি কিংবা পাড়া-মহল্লার কথা বলি, বড়দের দেখলে পরস্পর সম্মান প্রদর্শন করতো। স্কুলে সিনিয়র ভাই-বোনদের সামনেই যেতাম না। তাদের ক্লাসরুমের সামনে দিয়ে ঘুরাঘুরিও করতে সাহস পেতাম না। একধরনের শ্রদ্ধার ভয় মিশ্রিত ভালোবাসা ছিল আমাদের মধ্যে। বড়রাও স্নেহময় ছায়ায় আমাদেরকে আগলে রাখতেন। বাবা-মার বন্ধুদের অসম্ভব শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে দেখেছি। মহল্লার কেউ অসুস্থ হলে অথবা কেউ মারা গেলে সেদিন পুরো মহল্লা যেন অসুস্থ হয়ে যেতো।

শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বাবা-মা বলে দিত, শিক্ষকরা হলো বাবা-মায়ের পরের সম্মানিত ব্যক্তি। এমনকি তারা শাসন করে মারলেও ওই জায়গাটুকু বেহেশতে চলে যাবে, এমন করে আমাদের বাবা-মায়েরা  শিক্ষা দিয়েছেন। বন্ধুদের মধ্যে কেউ যদি অন্য বন্ধুকে মারতো, তখন শিক্ষকদের কাছে নালিশ করলে আর রক্ষে ছিল না৷ অভিভাবকরা স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের বলে দিত, এ সন্তান আপনাদের, আপনারা মানুষ করবেন, যা যা করা দরকার তা-ই করবেন।

আর এখন যদি কোনো শিক্ষক বেত্রাঘাত তো দূরের কথা, শিক্ষার্থীদের ভালোর জন্য সামান্যতম শাসন করে, অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের সামনে শিক্ষকদের মারার জন্য তেড়ে আসে। তাদের সন্তানরা এগুলো দেখে নিজের মতো করে সামাজিকীকরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠছে এবং শিশুরা মনে করছে এটাই ঠিক৷

শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী যদি কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসতো, তখনও আর রক্ষে ছিল না। অভিভাবকরা তখন বিষয়টি এমনভাবে আমলে নিতেন, নিশ্চয়ই তাদের সন্তানদের কোনো অন্যায় ছিল, তা নাহলে কেন এমন অভিযোগ নিয়ে আসলো। এইভাবে তখনকার শিশুরা তাদের ভুলগুলো বুঝতে শিখে নিজেদের সংশোধন করে নিতে পারতো। বর্তমানে অধিকাংশ পরিবারে এ অনুশাসনে শৈথিল্য দেখতে পাওয়া যায়।

সম্প্রতি মেট্রোরেলে এক সিনিয়র সিটিজেন দাঁড়ানো অবস্থায় স্ট্রোক করলো, অথচ আশেপাশের কেউ উনাকে বসার জন্য তাদের আসনটি পর্যন্ত ছাড়লো না। সেই ভদ্রলোক অবশেষে মারা গেলেন। সমাজের প্রচলিত লোকাচার লোকরীতি,  মূল্যবোধ, আদর্শ যা সমাজকে শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ রাখে। সমাজের বিবর্তনের সাথে সাথে উন্নয়ন, প্রগতি যতই হোক, কিন্তু যদি মৌলিক ভিত্তি যদি ভেঙে যায়; সমাজের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখতে পাওয়া যায়৷

আরও পড়ুন

সমাজের শৃঙ্খলা ও প্রগতির সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে অগাষ্ট কোৎ বলেন, সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে একটা সমন্বয়সাধন সমাজকে শৃঙ্খলিত করতে শেখায়। প্রতিটি সমাজে স্থিতিশীলতা ও সংহতি বজায় রাখতে পরিবার, ধর্ম, শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় খুবই প্রয়োজন। মানুষের সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক কর্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া, যা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত কমিয়ে সমাজের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি করে।

পরিবার মূল্যবোধ সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, এরপর ধর্ম, শিক্ষা, নৈতিকতা সমাজের মধ্যে মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের পরিবারগুলোতে আগের মতো অনুশাসন আমরা দেখতে পাই না, অথচ পরিবারিক শিক্ষা একজন শিশুর সামাজিকরণে সমাজে সভ্য হয়ে চলার শিক্ষা পেয়ে থাকে। বর্তমানে পরিবারের মধ্যে সামাজিকীকরণের শিথিলতা দেখতে পাওয়া যায়। ফলে কিশোর গ্যাং এর মতো এক অনাকাঙ্ক্ষিত সমাজের মধ্যদিয়ে আমরা যাচ্ছি।

আমাদের সমাজে কিশোর গ্যাং সমাজের সংহতি বিনষ্ট করে এক অচেনা পৃথিবীর জন্ম দিয়ে চলেছে, যা মারাত্মকভাবে সমাজের শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধের কথা প্রায়শ: বলছেন। তিনি বড়দের সম্মান, ছোটোদের স্নেহ করার যে সংস্কৃতি আমাদের সমাজে বিদ্যমান ছিল, তা বারংবার স্মরণ করিয়ে বলেন, সেই মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, টিস্যু পেপারটি যেখানে-সেখানে ফেলা উচিত নয়, আমি নিজেও যখন কোন ডাস্টবিন না খুঁজে পাই তখন টিস্যুগুলো পকেটে ভরে রাখি, বাসায় গিয়ে তারপর ফেলি। এছাড়াও প্রকৃতি এবং পশুর প্রতি সদয়ের জন্য বিশেষভাবে বলছেন।

সে লক্ষ্যে মূল্যবোধনির্ভর  পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে নির্দেশ প্রদান করেন। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সেমতে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য নতুন পাঠ্যপুস্তকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি মূল্যবোধনির্ভর পাঠ্যপুস্তক তৈরির কাজ শেষ করেন৷ পুস্তকটি রচনা ও সম্পাদনা করেন প্রফেসর ড. নাহরিন ইসলাম খান। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে হতে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরকম মূল্যবোধনির্ভর পুস্তকটি শিশুদের মনে পজিটিভ প্রভাব ফেলবে বলে আমরা মনে করি।

অবশ্য মূল্যবোধ কখনো সমাজ হতে সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যক্তিজীবন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নীতিকথা, সভা-সেমিনার কিংবা প্রচার-প্রচারণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে সৎকাজের মর্যাদা থাকবে, অন্যায়ের জবাবদিহিতা থাকবে এবং মানবিক আচরণের বাস্তব চর্চা থাকবে।

আমরা যদি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক,রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক মূল্যবোধ শিশুদের মনে প্রথিত করে দিতে পারি, তবে শিশুরা অচেনা এক পৃথিবী হতে বেড়িয়ে এসে নতুন সম্ভাবনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারবে।

লেখক: ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad