আইন কি পুলিশকে মানুষ হত্যার অধিকার দিয়েছে?

আইন কি পুলিশকে মানুষ হত্যার অধিকার দিয়েছে?
কার্টুন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

পরিস্থিতি তৈরি হলে পুলিশের ‘হত্যা করার অধিকার’ আছে বলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি আদৌ আইনসম্মত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশের সাবেক একজন মহাপরিদর্শক ও সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী টাইমসকে বলেছেন, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে পুলিশের বল প্রয়োগের আইনগত অধিকার থাকলেও সেটিকে হত্যার অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত মানবাধিকার কমিশনের একজন সদস্য বলেছেন, সরকারের দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে শব্দচয়ন ও আইনি ব্যাখ্যায় আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম টাইমসকে বলেন, ‘মূল বিষয় হলো, বল প্রয়োগের উদ্দেশ্য হতে হবে জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জীবন বাঁচানো, কাউকে হত্যা করা নয়।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী এখনো ট্রমার মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায় সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এ ধরনের বক্তব্য এলে বাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাদের মধ্যে এমন ধারণা জন্মাতে পারে, কর্তৃপক্ষই তাদের এ ধরনের বলপ্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে।’

জাহেদ উর রহমান ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের একজন কঠোর সমালোচক ছিলেন। সেই সরকার সমালোচনা সহ্য করে না বলে বিরোধী দলের অভিযোগের মধ্যেই তিনি সামাজিক মাধ্যম এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করতেন।

গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর জাহেদকে প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। এ ছাড়া তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন।

প্রতি মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্রিফিং করে আসছেন জাহেদ। প্রায় প্রতিটি ব্রিফিংয়ের পরেই তার বক্তব্য নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হয়। তার বক্তব্যের কারণে সরকারকে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র কটাক্ষের স্বীকার হতে হচ্ছে বলেও আলোচনা আছে। অনেকেই বলে থাকেন, সরকারের জনসংযোগ করতে গিয়ে তিনি জনসংযোগ বিপর্যয়ের কারণ হচ্ছেন।

জাহেদ এবারের ব্রিফিংয়ে মূলত পোশাকশ্রমিক বিক্ষোভ ও এলপিজির দাম আরও বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দর দুই হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন।

শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশের বল প্রয়োগ নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পুলিশের বল প্রয়োগ করার আইনি অধিকার আছে। পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারে মধ্যে কাউকে হত্যা করার অধিকার আছে যদি সেই ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় আইনি অধিকারের মধ্যে।’

অবশ্য তিনিও এও বলেন, ‘আমরা চেয়েছি যে আগে যেভাবে এগুলো দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে এই সরকার সেটা ওভাবে চাইছে না।…আমরা এটাকে এমনভাবে করতে চাই যেন এটা জনগণের ওপরে খুব কম ক্ষয়ক্ষতি হয়, খুব কম সমস্যা হয়, সেভাবেই করতে চাই।’

আরও পড়ুন

উপদেষ্টা কি সঠিক বলেছেন–টাইমসের প্রশ্নে সাবেক পুলিশ প্রধান বাহারুল আলম বলেন, ‘পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তবে কাউকে হত্যা করার অধিকার—আইনের ভাষা এমন নয়। কোনো ব্যক্তির জীবন হুমকির মুখে পড়লে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে কেউ মারা গেলেও সেটি আত্মরক্ষার পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত; একে সরাসরি হত্যার অধিকার বলা যায় না।’

দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৯৬ থেকে ১০২ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এর ১০০ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির এমন আক্রমণের মুখে পড়লে, যাতে যুক্তিসংগতভাবে মৃত্যু বা গুরুতর জখমের আশঙ্কা তৈরি হয়, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে আক্রমণকারীর মৃত্যু ঘটতে পারে—এমন বল প্রয়োগও আইনগতভাবে আত্মরক্ষার আওতায় পড়তে পারে।

তবে দণ্ডবিধির ৯৯ ধারা অনুযায়ী, আত্মরক্ষার নামে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্ষতি করা যাবে না। অন্যদিকে, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১২৭ ও ১২৮ ধারায় বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে নির্দেশ দেওয়ার এবং নির্দেশ অমান্য করলে বল প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, এসব আইনে পুলিশকে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মত বল প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হলেও আন্দোলন দমন, জনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা আইন অমান্যের কারণে কাউকে হত্যার সাধারণ অধিকার দেওয়া হয়নি।

সাবেক আইজিপি বাহারুল বলেন, ‘জনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে প্রথমে মাইকিং করে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিতে হয়। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে টিয়ার গ্যাস, ওয়াটার ক্যানন ও লাঠিচার্জের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে জনতা পুলিশের ওপর আক্রমণ করলে এবং পুলিশের জীবনহানির আশঙ্কা তৈরি হলে আইন অনুযায়ী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশ্ন আসতে পারে।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমসকে বলেন, ‘পুলিশ কেবল আত্মরক্ষার স্বার্থে এবং জীবনহানির আশঙ্কা তৈরি হলেই গুলি করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রথমে টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জসহ অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার বল প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। গুলি চালানো সর্বশেষ পদক্ষেপ। আর গুলি করলেও তা পায়ে করতে হবে, বুকে করা যাবে না।’

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ইলিরা দেওয়ান বলেন, ‘পুলিশের বল প্রয়োগের কারণে অতীতের সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। এখন আবার একইভাবে বল প্রয়োগকে আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে পরিবর্তনের মূল লক্ষ্যই ব্যর্থ হবে।’

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ এবং ঢালাও গুলি করে হত্যার ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। সেই বিচারে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা, সহযোগী সংগঠনের নেতাদের পাশাপাশি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আসামি হয়েছেন। এরই মধ্যে বেশ কিছু মামলার রায় প্রকাশ হয়েছে।

ইলিরা সরকারের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আইজিপি ক্রসফায়ারের কথা বলেছেন, সরকারের একজন উপদেষ্টা একই ধরনের কথা বলেছেন। তাহলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।’

বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না বলে মত দেন তিনি। বলেন, ‘শ্রমিকদের মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শ্রমের যথাযথ মূল্যায়নের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। একজন শ্রমিকেরও বেঁচে থাকার অধিকার ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, তবে সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া এবং সমঝোতার পথ তৈরি করা সম্ভব। অতীতেও গুলি চালিয়ে আন্দোলনের স্থায়ী সমাধান আসেনি। তাই আবারও একই পথে হাঁটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী মনে করেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে শব্দচয়ন ও আইনি ব্যাখ্যায় আরও সতর্ক হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য সরকারের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। শ্রমিক আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের অসন্তোষের মধ্যে পুলিশের বল প্রয়োগ নিয়ে এমন মন্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। সরকারের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে না পারলে জনসংযোগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

যে ব্রিফিংয়ে ‘পুলিশের হত্যার’ অধিকার নিয়ে জাহেদ কথা বলেছেন, একই আয়োজনে তিনি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়েও কথা বলেছেন।

আগের দিন এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। জাহেদের দাবি, জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই বক্তব্য নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ট্রোলের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।

জাহেদ এর আগেও এমন অনেক কথা বলেছেন, যা নিয়ে সরকারকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে।

জাহেদ কি জনসংযোগের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন নাকি উল্টো সরকারের জন্য দায়ে পরিণত হচ্ছেন? এই প্রশ্নে সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘তার আরও পরিষ্কার করে বলা দরকার, যাতে বক্তব্যের সঠিক অর্থ বোঝা যায়।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad