ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন চার দিনে গড়ালেও সংঘাত থামেনি। পুলিশের ভাষ্য, এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগে আটক হয়েছে ৬৮ জন।
গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে এই আন্দোলনের অর্থ ও নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের নাম ওঠে এসেছে।
এ ছাড়া পল্লবী ও মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য লোকজন সংগ্রহ ও সমন্বয়ক হিসেবে ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এবং জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েলের নাম জানিয়েছে পুলিশ।
ইন্ধনদাতা হিসেবে কিছু গার্মেন্টস কারখানা মালিক এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের নাম উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও লাঠি হাতে মাঠে নামে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
সহিংসতার মুখে মঙ্গলবার সকালে মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও সাভার-আশুলিয়ার ৩০৬টি কারখানা ছুটি দেওয়া হয়। ফলে প্রায় সাত লাখ শ্রমিকের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, আন্দোলনের আড়ালে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে রাজনৈতিক ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগে ঢাকায় ৩৩ জন এবং বাইরে থেকে ৩৫ জনসহ মোট ৬৮ জনকে আটক করা হয়। গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছে, আন্দোলনকারীদের মধ্যে ফুটপাতের হকাররাও ঢুকে পড়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিল্প খাত ধ্বংস বা দেশ অস্থিতিশীল করার যেকোনো চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। গ্রেপ্তার হওয়া অনেকে প্রকৃত শ্রমিক নন বলেও দাবি করেছে পুলিশ।
পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের কেউ শ্রমিক নন। শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত রয়েছে। যারা ইন্ধন দিচ্ছেন বা অর্থায়ন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনের মধ্যে থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মঙ্গলবার সকালে মিরপুরের পল্লবীতে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের তুমুল সংঘর্ষ হয়। টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়ে পুলিশ। সংঘর্ষের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে মিরপুর-১০ ও ১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন কিছুক্ষণ বন্ধ রাখা হয়। একপর্যায়ে দলছুট আন্দোলনকারীদের হামলায় সাইমন নামে এক পুলিশ কনস্টেবল আহত হন। পরে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে এলাকায় মিছিল করে।
গাজীপুরের নাওজোড় ও ভোগড়ায় মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। সেখানে পুলিশ ও শ্রমিকসহ প্রায় ৩০ জন আহত হন। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। দুপুরে শ্রমিকেরা কালিয়াকৈর থানা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করলে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে পুলিশ তাদের তাড়িয়ে দেয়।
সাভার ও আশুলিয়াতেও কয়েকটি কারখানায় হামলা ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। সেখানেও পুলিশ টিয়ারশেল ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাত ৮০০ থেকে ১ হাজার জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাতেও পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি)


