আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। বর্তমানে দলটিতে কোনো পদে না থাকলেও অনেক প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা ও সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে হামলা ও মামলার ভয়ে তাদের অনেকেই এখনো প্রকাশ্যে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করছেন না।
বর্তমান সরকার গঠনের পর থেকেই স্থানীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে জনমনে জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার আগেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হবে কি না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান সরকার এই বিধান বহাল রেখে অধ্যাদেশটি আইন আকারে পাস করার কথা জানিয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে নিশ্চিত করেছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতি দল-কেন্দ্রিকতা থেকে ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতায় মোড় নেবে। এখানে প্রার্থীর দলীয় পরিচয়ের চেয়ে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম এ বিষয়ে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা উচিত নয়। তার মতে, দলীয় প্রতীক প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে আড়াল করে দলের প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। তাই দলীয় প্রতীক না থাকলে প্রার্থীর মেধা ও যোগ্যতা গুরুত্ব পাবে।
স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলীয় প্রতীক না থাকলে তাদের কিছু সমর্থক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেতে পারেন। তাদেরকে নির্বাচন থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার কোনো উপায় থাকবে না।
তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অনেক সাবেক নেতা যারা বর্তমানে দলীয় পদে নেই কিন্তু স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী, তারা নীরবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা সাধারণ ভোটারদের সাথে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন এবং পুরনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্কগুলোকে আবার সক্রিয় করছেন। তবে গ্রেফতার বা আইনি জটিলতার ভয়ে তারা সতর্ক আছেন।
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কাকলনগর ইউনিয়নের একজন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জানান, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি অনুকূল নয়। তবে জনগণের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, সুযোগ পেলে তারা অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নেবেন।
সরকার পতনের পর থেকে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম মুঠোফোনে টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলে তাদের অনেক কর্মী-সমর্থক অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য রাজনীতিতে ফিরে আসা। যারা গণতন্ত্রের কথা বলেন, তারা কেন একটি দলকে নিষিদ্ধ করে রেখেছেন সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। নাসিম আরও দাবি করেন, তাদের রাজনীতি শুধু প্রতীকের ওপর নির্ভরশীল নয়। জনগণের সাথে সুসম্পর্কই তাদের বড় শক্তি। এই শক্তি নিয়েই তারা ফিরে আসতে চান।
অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াত নেতারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দলটি বর্তমানে নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী রূপ পাবে বলেও তারা বিশ্বাস করেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, একটি আইনত নিষিদ্ধ দলের কারও নির্বাচনে অংশ নেওয়া অবাস্তব। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। তার আগে তারা এটি নিয়ে চিন্তিত নন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হবে না।
উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে বিএনপি ও জামায়াত এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছিল, এটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করবে।
বর্তমানে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ বিতর্ক চলছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিতেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সরকার একে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ ভেঙে দেয়। এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অবশ্য ঢাকার একটি সিটি কর্পোরেশনে নিয়োগ লাভ করেন একজন বেসরকারি ব্যক্তি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে তিনিও পদত্যাগ করেন। বর্তমান সরকার সম্প্রতি সকল শূন্য সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।


