রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী মাজারের কয়েক হাজার কোটির টাকার সম্পত্তি ঘিরে গড়ে উঠেছে দুর্নীতি-অনিয়ম-চাঁদাবাজির এক ‘দুষ্টচক্র’।
টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহ আলী মাজারের হাজার হাজার কোটি টাকার ওয়াকফ সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা কাঁচামালের আড়ত ও দোকান বরাদ্দে রয়েছে অনিয়ম। সেখানের চাঁদাবাজিও এখন নিত্য বিষয়। এর সবই হচ্ছে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায়।
শাহ আলী মাজার ও বিশাল সম্পত্তির দেখভালে জড়িতদের দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও কর্তৃপক্ষ উদাসিন। মাজারে আগত ভক্তদের কাছ থেকে সংগৃহীত দান এবং বার্ষিক উরস মাহফিলের জন্য সংগৃহিত অর্থের অপব্যয়েরও অভিযোগ রয়েছে।
অনেক ভক্ত অভিযোগ করেছেন, মাজার পরিচালনায় জড়িত বিভিন্ন গোষ্ঠী শুধু দুর্নীতিতেই জড়িত নয়, তাদের কোনো জবাবদিহিতাও নেই। তাদের মতে, মাজারের প্রশাসন তাদের ইচ্ছামতো কাজ করছে, এবং কোনও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
সরকারি তদন্তেও মাজারের সম্পত্তি ঘিরে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মাজারের সম্পত্তিতে আড়ত ও দোকান বরাদ্দের কার্যক্রম এবং নতুন বরাদ্দ নিয়ে অনেকেই আপত্তি তুলছেন।
এ সংক্রান্ত ভিডিও প্রতিবেদন দেখুন এখানে
শাহ আলী মাজারের মোতওয়াল্লি (ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপক) এবং ঢাকা জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ টাইমসকে জানান, মাজারের দুর্নীতি সম্পর্কিত একটি তদন্ত চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘তদন্তে ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে বাতিল করা হয়েছে পূর্ববর্তী অনেক বরাদ্দ ও ইজারা।
মাজারের বিশাল জমি বেহাত
মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে শাহ আলী মাজারের জমিতে কাঁচামাল গুদাম ও দোকানসহ অনেক স্থাপনা রয়েছে। এসব পরিচালনা করেন জন্য প্রায় ১৩০ জন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী। মাজারের মোট জমির পরিমাণ ৩২ দশমিক ১৪ একর (৯৭.৪০ বিঘা)। কিন্তু মিরপুর ভূমি অফিসের রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র ৫ দশমিক ৭৬ একর জমি মাজারের দখলে রয়েছে। তবে মাজারের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম দাবি করেছেন, মাজারের জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৭৭ একর। যদিও ভূমি অফিসের রিপোর্ট অনুযায়ী, মাজারের প্রায় ২২ দশমিক ০১ একর জমি বেদখল হয়ে গেছে।
সরকারি তদন্তেও দুর্নীতি-অনিয়মের চিত্র
বাংলাদেশের ওয়াকফ প্রশাসনের সহকারী প্রশাসক ফরিদ আহমেদ জানান, মাজারের পরিচালনা কমিটি এবং মোতওয়াল্লি সবকিছু দেখাশোনা করেন। কেউ যদি অভিযোগ করেন, তবে তা পরিচালনা কমিটিকে জানানো হয় এবং তারা সব সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন শাহ আলী মাজারের কার্যক্রম সম্পর্কে খুব বেশি জানে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মাজারের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা জেলা প্রশাসক কমিটির মোতওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সদস্যরা হয়েছেন অন্তর্ভুক্ত।
গত বছর ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসের সহকারী কমিশনার মারজানুর রহমান পুরো বিষয়টির তদন্তের দায়িত্ব পান। তার অফিসের তথ্যমতে, একটি ১৪০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে মাজারের সম্পত্তি নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি প্রমাণিত। মাজারের সম্পদ বহু বছর ধরে অপব্যয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, ২৪ দশমিক ৯২ একর জমি তিনটি মৌজায়, যার মধ্যে ১৯ দশমিক ৫২ একর বিশিল মৌজা, ৪ দশমিক ৩৫ একর ছোট দিয়াবাড়ি মৌজা এবং ১ দশমিক শূন্য ৫ একর জহুরাবাদ মৌজা, শাহ আলী মাজারের ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত। এছাড়া ২০২২ সালে একটি রিট আবেদন করা হয়েছিল, যেখানে আরও ৭ দশমিক ২২ একর জমি মাজারের সম্পত্তি হিসেবে দান করার কথা বলা হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে ৭৫ বিঘা জমি উদ্ধার করার জন্য একটি রিট আবেদন করা হলেও জমি উদ্ধার করা হয়নি।
দখলে আওয়ামী লীগের অনেকে
রিট আবেদনকারী অ্যাডভোকেট মো. সালাহ উদ্দিন সিকদার দাবি করেছেন, মাজারের পরিচালনা কমিটির সাহায্যে দোকান মালিকরা মাজারের সম্পত্তি দখল করছেন। ছোট দিয়াবাড়ি এবং দক্ষিণ বিশিল মৌজায় প্রায় ২ দশমিক ৭ একর জমি বহু বছর ধরে দখল মুক্ত রয়েছে। ছোট দিয়াবাড়ি এলাকার অংশটি তুরাগ নদীর দখলে চলে গেছে এবং দক্ষিণ বিশিল এলাকায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নাবিল খান জমির দখল নিয়েছেন, যেখানে তিনি তার বাবা সেলিম খানের নামে একটি দোতলা মার্কেট নির্মাণ করেছেন।
অভিযুক্ত নাবিল খান জুলাই হত্যাকাণ্ডে আসামি এবং বর্তমানে পলাতক।
কাঁচামাল ও ফলের আড়ত ব্যবস্থাপনার ইজারাদার সাইফুল ইসলাম টাইমসকে জানিয়েছেন, আড়ত পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছে কয়েকটি সংগঠন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দুই কোটি টাকায় একটি ইজারা স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে ৫ মে আড়তটি হস্তান্তর করার কথা থাকলেও মফিজুর রহমান বেবুর কারসাজিতে (সাবেক এমপি আসলামুল হকের বড় ভাই) চুক্তি অনুযায়ী আড়তটি হস্তান্তর হয়নি।
ঢাকা-১৪ আসনের সাবেক এমপি আসলামুল হক ও মাইনুল হোসেন নিখিলের দায়িত্বকালে মাজারের বিপুল সম্পত্তি লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি।
দোকান বরাদ্দের জন্য টাকা জমা দিয়েছিলেন, এমন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তারা বরাদ্দ পেয়েছেন, কিন্তু দখল বুঝে পাননি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাজারের সম্পত্তি থেকে নিয়মিত যে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়, এর কোনো জবাবহিদিতা নেই।
তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের পরও শাহ আলী মাজারে দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার চিত্র পাল্টায়নি, মহানগরীর এই মাজারের সম্পত্তি ঘিরে গড়ে উঠেছে অভিযোগের পাহাড়। সরকার পরিবর্তনের পর পাল্টেছে দখলদার ও চাঁদাবাজি।


