ভোটের আগে নিরাপত্তাহীনতায় হিন্দুরা

ভোটের আগে নিরাপত্তাহীনতায় হিন্দুরা
দিপু দাসের স্ত্রী মেঘনা রানী। ছবি: এপি
Advertisement
Advertisement

গত ডিসেম্বরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করার অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস নামে ২৭ বছর বয়সী এক হিন্দু পোশাক শ্রমিককে অভিযুক্ত করেন তার কয়েকজন মুসলিম সহকর্মী। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে দিপু দাসের কর্মস্থলে চড়াও হয় একদল উত্তেজিত জনতা। দিপুকে পিটিয়ে হত্যা করার পর তার দেহ একটি গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পুরো বাংলাদেশ জুড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন অত্যন্ত আতঙ্কের সাথে তাদের মোবাইল ফোনে এই ঘটনার ভিডিও দেখেন। এর প্রতিবাদে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা বিচার এবং সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপত্তার দাবি জানান। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এই ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেয়। পুলিশ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে প্রায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে মানবাধিকার সংগঠন এবং হিন্দু নেতারা বলছেন যে এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তাদের মতে, এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বাড়তে থাকা হামলারই একটি অংশ, যা তীব্র মেরুকরণ, ইসলামপন্থীদের পুনরুত্থান এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ডালপালা মেলছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে হিন্দুদের মধ্যে ভয় আরও জেঁকে বসেছে।

ঢাকার হিন্দু মানবাধিকার কর্মী রঞ্জন কর্মকার বলেন, “এখন আর কেউ নিরাপদ বোধ করছে না। সবাই ভীষণ আতঙ্কে আছে।”

বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে হিন্দুরা একটি ছোট সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যাদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৩১ লাখ বা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, দেশের জনসংখ্যার ৯১ শতাংশই মুসলিম।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোর্চা সংগঠন ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে তারা দুই হাজারেরও বেশি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে।

এই সংগঠনটির হিসাবে অন্তত ৬১টি হত্যাকাণ্ড, নারীদের ওপর ২৮টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনাও রয়েছে। এছাড়া উপাসনালয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৯৫টি। তারা ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে এসব সহিংসতার প্রতিবেদনগুলো নিয়মিতভাবে উপেক্ষা করা বা গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর অভিযোগও তুলেছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) পক্ষ থেকে এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে ড.  ইউনূসের প্রেস টিমের একজন কর্মকর্তা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি, এসব ঘটনার বেশিরভাগই ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত নয়।

বাংলাদেশে অতীতেও নির্বাচনের সময় সহিংসতা বেড়েছে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই বারবার এর শিকার হয়েছে। তবে এবার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত। অনেক হিন্দু এখন চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন, কারণ দীর্ঘকাল ধরে তাদেরকে হাসিনার সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মানবাধিকার কর্মী রঞ্জন কর্মকার বলেন, হিন্দুদের নিয়ে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, তারা সবাই মিলে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে ভোট দেয়। এই ধারণাই তাদেরকে আরও বেশি বিপদের মুখে ফেলে দেয়।

তিনি আরও বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রায় প্রতি সপ্তাহে ঘটতে থাকা নানা ঘটনার কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের কিছু অংশে হিন্দুরা এখন ‘অস্তিত্ব সংকটে’র মুখে আছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

আরও পড়ুন

রঞ্জন কর্মকার বলেন, “এই সহিংসতার সাথে যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না বা বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে না। এর ফলে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা জন্মাচ্ছে যে, এই সহিংসতা চলতেই থাকবে।”

হিন্দুদের ওপর এই হামলার আধিক্য এমন এক সময়ে দেখা যাচ্ছে যখন বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন আবার প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার এবং কঠোর দমনের কারণে কোণঠাসা হয়ে থাকার পর দলটি এই নির্বাচনকে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ফিরে পাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে।

জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে ১১টি দলের একটি বৃহত্তর ইসলামপন্থী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই জোটে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি-র মতো ছাত্র-নেতৃত্বাধীন দলও রয়েছে, যাদের নেতারা ২০২৪ সালের আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ইসলামপন্থীদের ফিরে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য কেমন হবে তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় জামায়াতে ইসলামী তাদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। তবে এখনও তারা শরীয়াহ আইনের পক্ষেই কথা বলে। তারা এমন সব জনসভা করছে যেখানে হিন্দুরা অংশ নিচ্ছেন, এমনকি তারা একজন হিন্দু নেতাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নও দিয়েছে।

অন্যদিকে, এনসিপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার নাগরিকদের পাশে দাঁড়াবে। তারা জানিয়েছে, ক্ষমতায় গেলে তারা সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় মানবাধিকার কমিশনের অধীনে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, এই ধরনের পদক্ষেপগুলো মূলত লোক দেখানো। তিনি বলেন, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন হিন্দু  প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে সংখ্যালঘুদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রতি কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রকাশ করে না।

আলতাফ পারভেজ আরও বলেন, ভোটের আগে সংখ্যালঘুদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য গ্রামীণ এলাকাগুলোতে সুপরিকল্পিতভাবে হামলার একটি ধারা দেখা যাচ্ছে। তার ভাষায়, “এটি আগামী নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটারদের অংশগ্রহণের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।”

ভারতের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা প্রতিবেশী ভারতের সাথেও সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করেছে। এর ফলে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কড়া সমালোচনা করেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি অভিযোগ করে যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ‘পরিকল্পিত হামলার ধারা’ চলছে; অথচ বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। ভারত আরও বলেছে, এই সহিংসতাকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক শত্রুতা বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর জবাবে ভারতের এই সমালোচনাকে বাংলাদেশ-বিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়ার ‘প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে  বাংলাদেশ।

এই কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব এখন ক্রীড়াঙ্গনেও প্রভাব ফেলছে। উভয় দেশই একে অপরের জন্য ভিসা সেবা আংশিকভাবে স্থগিত করেছে, কূটনৈতিক মিশন রক্ষায় ব্যর্থতার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে। ভারতে বিক্ষোভের মুখে ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ আইপিএল থেকে একজন বাংলাদেশী খেলোয়াড়কে নিষিদ্ধ করে, যার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ এই মাসে ভারতে হতে যাওয়া বিশ্বকাপ বর্জন করেছে।

ভারতের জিন্দাল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ভারতের এই উদ্বেগ অত্যন্ত ‘যৌক্তিক’। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের হিন্দুরা খুবই অসহায় একটি গোষ্ঠী যারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। আর ইউনূস প্রশাসন জেনেশুনেই এসব বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে।”

পরিবারের বিচার দাবি

যারা এই সহিংসতার প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছেন, তাদের জন্য এই ক্ষতি অপূরণীয়। দিপু দাসের মৃত্যুর খবর যখন ময়মনসিংহের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা স্তব্ধ হয়ে যান। অনেকেই তার হত্যাকাণ্ডের সেই বীভৎস ভিডিও মোবাইলে দেখেছেন।

দিপুর বাবা বলেন, “মানুষ যখন বলে তারা এটা মোবাইলে দেখেছে, তখন আমার বুকটা ফেটে যেতে চায়।”

পরিবার ও আত্মীয়রা জানান, দিপু অত্যন্ত শান্ত ও নম্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার অকাল মৃত্যুতে তার স্ত্রী ও বৃদ্ধা মায়ের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

তার মা শেফালী রানী দাস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে বলেন, “তারা ওকে মারল, গাছে ঝোলাল আর আগুনে পুড়িয়ে দিল। আমি এর বিচার চাই।”

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad