আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কায় সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে নির্বাচনকালীন সহিংসতার সতর্কতা দেওয়ার পর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এই বাড়তি পদক্ষেপ নিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগামী ১০ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনের পুরো সময়কালে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, বড় ধরনের জনসমাগম এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত জখমের ঝুঁকি বিবেচনা করেই এই বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক আবু হোসেন মো. মইনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক আদেশে জানানো হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত মেডিকেল টিম মোতায়েন করতে হবে। অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি জরুরি বিভাগ এবং ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুমগুলো পুরোপুরি সচল রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি সিটি করপোরেশনে ছয়টি করে মেডিকেল টিম থাকবে। এ ছাড়া বিভাগীয় পর্যায়ে চারটি, জেলা পর্যায়ে তিনটি, উপজেলা পর্যায়ে দুটি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে অন্তত একটি করে মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হবে। নির্বাচনের সময় যদি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তবে হাসপাতালগুলোকে নিজস্ব জনবল বা কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
আদেশে আরও বলা হয়েছে, হাসপাতাল প্রধানদের অবশ্যই কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কাউকে কোনো ছুটি দেওয়া হবে না। জরুরি সেবা, ভর্তি রোগীর চিকিৎসা, ল্যাবরেটরি, ডায়ালাইসিস ইউনিট এবং সিটি স্ক্যান ও এমআরআই-সহ সব ডায়াগনস্টিক সেবা এই সময়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখতে হবে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, অতীতের নির্বাচনগুলোতে জনাকীর্ণ এলাকাগুলোতে হঠাৎ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তাই এবার আগেভাগেই পূর্ণ প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। অনেক হাসপাতাল ইতোমধ্যেই বিশেষ জরুরি দল (কুইক রেসপন্স টিম) গঠন করেছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনটি হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভিড় ও সহিংসতার আশঙ্কার মধ্যেও যেন চিকিৎসা সেবা ব্যাহত না হয়, তারা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছেন।
এই সতর্কতা এমন এক সময়ে দেওয়া হলো যখন পুলিশ সদর দপ্তর দেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অবশ্য এই তালিকায় কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকি নয়, বরং যাতায়াত ব্যবস্থা এবং ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থাকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ ও সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে চিকিৎসা ও নিরাপত্তার বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের এক হাজার ৫৬২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৫৩টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৫টি কেন্দ্রকে জেলা পুলিশ এবং ৩০৮টি কেন্দ্রকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’বা ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রস্তুতি নিয়েছি। নির্বাচনের আগে ও পরে মোট তিন দিন প্রতি উপজেলায় দুই শিফটে দায়িত্ব পালনের জন্য দুইজন করে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
রাজধানী ঢাকার দুই হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৯৫টি কেন্দ্রকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৮৫ শতাংশ ভোটকেন্দ্রই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির সম্মুখীন।
দেশের বৃহত্তম সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচনের সময় সহিংসতার ঝুঁকি থাকেই, তাই আমরা আগে থেকেই প্রস্তুত। তবুও জরুরি সেবা বিভাগগুলোকে নিয়ে আমরা একটি সমন্বয় সভা করছি, যাতে পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।’
ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের একটি বিশেষ র্যাপিড অ্যাকশন টিম আছে। জরুরি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে আমরা সমন্বয় সভা করব। বড় কোনো দুর্ঘটনার রোগীরা সাধারণত শেষ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলেই আসে এবং আমরা একসঙ্গে ২০০ রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষমতা রাখি।’
তিনি জানান, সাড়াদানের প্রথম ধাপ হিসেবে প্রায় ৫০০ ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং সার্বক্ষণিকভাবে প্রায় ২০০ চিকিৎসক হাসপাতালে নিয়োজিত থাকবেন।
সাতক্ষীরায় ১৭৯টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন মো. এ সালাম জানান, জেলা পর্যায়ে তিনটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে এবং প্রতিটি উপজেলা দুটি করে টিম পাবে। ১০ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্ধারিত কর্মীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো সহিংসতা ঘটলে আমাদের জরুরি টিমগুলো দ্রুত সক্রিয় হবে।
সম্প্রতি সহিংসতা হওয়া গোপালগঞ্জ জেলাতেও বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলার ৩৯৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৯৭টিই ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’।
গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সব পদক্ষেপ নিয়েছি। নির্বাচন-সংক্রান্ত যেকোনো ঘটনায় জরুরি চিকিৎসা দিতে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’


