বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলে ২৫ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা ‘রেড নোটিশ’ জারির আবেদন করলেও কারো নামেই নোটিশ জারি হয়নি বলে জানা গেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত এক বছরে এসব আবেদন করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রেড নোটিশ জারির ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিলে পুলিশ ইন্টারপোল হেডকোয়ার্টার্সে আবেদন করে।
পুলিশের আবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ দম্পতি, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ দম্পতি, এস আলম গ্রপের কর্ণধার সাইফুল আলম ও চার সহোদর, তিন পোশাক কারখানা মালিকসহ ২৫ জনের নাম রয়েছে। তবে ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে রেড নোটিশের তালিকায় তাদের কারো নাম দেখা যায়নি।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়েছে। ইন্টারপোল ডেস্কের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) আলী হায়দার চৌধুরী আবেদন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘ইন্টারপোলের লিগ্যাল কমিটি রয়েছে। তারা সম্মত হলে রেড নোটিশ টাঙানো হয়। আবেদনে সম্মত না হওয়ায় গত এক বছরে কারো নামে রেড নোটিশ জারি হয়নি।’
আইজিপি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে-মেয়েদের নামে রেড নোটিশ জারি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সরকার টু সরকার” আলাপ করে উদ্যোগ না নিলে ভারত থেকে শেখ হাসিনাসহ অন্যদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নাও হতে পারে।’
ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, রেড নোটিশে বিশ্বের ৬ হাজার ৫১১ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ জন বাংলাদেশি। তালিকায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, যুদ্ধাপরাধের মামলা, জঙ্গি, শীর্ষ সন্ত্রাসী, মডেল তিন্নি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসেন জানান, ইন্টারপোল ডেস্ক থেকে গত এক বছরে (২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি সময় পর্যন্ত) ২৫ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির জন্য আবেদন করা হয়েছে।
তার দাবি, ইন্টারপোল এ পর্যন্ত চারজনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছে। তবে ওই চারজনের নাম জানাতে পারেননি তিনি।
অবশ্য ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে রেড নোটিশ তালিকায় গত এক বছরে কোনো বাংলাদেশির নাম যোগ হয়নি।
দুদকের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম জানান, আদালতের আদেশ পেয়ে গত এক বছরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ তার স্ত্রী রুকমীলা জামান, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, তার স্ত্রী জিসান মির্জা, এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার তিন ভাই- রাশেদুল আলম, মারুফ আলম এবং মাজেদুল আলমের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেডনোটিশ জারির জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আবেদন করা হয়।
আদালতে দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মীর আহমেদ আলী সালাম জানান, তদন্ত কর্মকর্তার চাহিদা পেয়ে আদালতে আবেদন করা হয় রেড নোটিশ জারির। এরপর আদালত আদেশ দিলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স তা কার্যকর করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তার ছেলেমেয়েসহ অনেকের বিরুদ্ধে আদেশের ব্যাপারে পুলিশ অবগত হয়ে ইন্টারপোলে চিঠি দিয়েছে।
যাদের নামে রেড নোটিশ জারির আবেদন:
আদালতের নিবন্ধন শাখার তথ্য মতে, গত ১৯ এপ্রিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়। বিদেশে পলাতক ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে ইন্টারপোলের কাছে পৃথক তিন ধাপে আবেদন করে এনসিবি।
শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান, আ ক ম মোজাম্মেল হক, হাছান মাহমুদ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মহিবুল হাসান চৌধুরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, মাহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার একটি আদালত বেনজীরের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন।
৪ সেপ্টেম্বর প্লট জালিয়াতি মামলায় দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির পদক্ষেপ নিতে পুলিশ সদরদপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের করা মামলায় শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেয় আদালত। ২৭ এপ্রিল ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গালিব এ আদেশ দেন।
দুদকের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করে দুদক। পরে আদালত শুনানিতে আবেদন মঞ্জুর করেন।
এস আলম গ্রুপের কর্নধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার তিন ভাই রাশেদুল আলম, মারুফ আলম এবং মাজেদুল আলমের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক সাব্বির ফয়েজ। দুদক ২৫ সেপ্টেম্বর এই আদেশ দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে অর্থ পাচার ও বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং তার স্ত্রী রুকমীলা জামানের বিরুদ্ধে ২১ সেপ্টেম্বর ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করার আদেশ দিয়েছে আদালত। চট্টগ্রাম মহানগর স্পেশাল জজ (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবদুর রহমানের আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেয়।
বিভিন্ন আদালতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়েরকৃত মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১ সেপ্টেম্বর তিন গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য ইন্টারপোল সদরদপ্তরে পত্র দিয়েছে পুলিশ। ৩টি গার্মেন্টস মালিক হলেন, টিএনজেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন শামীম, ডার্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান ইত্তেমাদ উদ দৌলাহ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল উদ দৌলাহ এবং রোর ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুল ইসলাম।
গত ২৩ আগস্ট এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের দ্বিতীয় পলাতক স্ত্রী শাম্মি আখতার ও মেয়ে ফারজানা আখতার ইপশিতাকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলে আবেদন করে এনসিবি।


