জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি জানান, আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সরকার এই নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তা স্বচ্ছ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
প্রধান উপদেষ্টার সম্পূর্ণ ভাষণ
মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণে জাতিসংঘের ভূমিকা, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি জাতিসংঘের ৮০ বছরের অগ্রগতির প্রশংসা করে বলেছেন, বিশ্বব্যাপী শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের অবদান অনস্বীকার্য।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘জাতিসংঘের সনদের আট দশক পূর্তিতে সবাইকে অভিনন্দন জানাতে চাই, যেটি একটি বিশাল মাইলফলক। জাতিসংঘের ৮০ বছরের পথচলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ সময়ে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
বাংলাদেশের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি। ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশ জন্ম লাভ করেছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে, বলেন মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি আরও বলেন, ‘এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের অজস্র ত্যাগ, আর আমরা বহুবার স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি।’
‘এ বছর “জুলাই গণঅভ্যুত্থান”-এর প্রথম বার্ষিকী পালন করে বাংলাদেশ, যা তরুণদের আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ নতুনভাবে পথচলা শুরু করেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য ১১টি স্বাধীন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সরকার সেগুলোর ভিত্তিতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে,’ বলেন তিনি।
ইউনূস বলেন, ‘এ সংস্কারের ফলে আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো গড়েছি, যেখানে কোনো স্বৈরশাসক আর উত্থান করতে পারবে না।’
তিনি জানান, দেশব্যাপী রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশ মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন, নারী অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রমের দিকে সরকার আরও জোর দিচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরেন ইউনূস। তিনি মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের অবস্থার দিকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন এখনও সম্ভব হয়নি, যদিও আট বছর পার হয়ে গেছে। আমাদের কাজ শুধু মানবিক সাহায্য দেওয়া নয়, বরং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানও খুঁজে বের করা।’
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রশংসা করে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রায় ছয় হাজার শান্তিরক্ষী জাতিসংঘের অধীনে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আমাদের অবদান অব্যাহত থাকবে এবং এর জন্য আরও কার্যকরী বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন।’
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বাংলাদেশের তরুণদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম প্রমাণ করেছে যে তারা সমাজ পরিবর্তনের শক্তি। আমরা তাদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করছি, যেন তারা শুধু চাকুরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তরুণদের জন্য প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তি, এবং অন্যান্য আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হল সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি উন্নত বাংলাদেশ গঠন করা।’
ভাষণের শেষে, মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানান, যেন তারা বহুপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে।
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব শান্তির জন্য আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, এবং জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে এটি মানুষের কল্যাণের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে।’


