করোনা মহামারিতে লম্বা সময় স্কুল বন্ধ থাকা থেকে শুরু করে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সংকট, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও এর পরের নানা অস্থিরতা—গত ছয় বছর ধরে বারবার পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটার পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলে খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে এই পরিস্থিতির প্রভাব। এ বছর প্রায় প্রতি দুজন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজন ফেল করেছেন, পাসের হার নেমে এসেছে গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে।
শিক্ষার কোথায় গলদ ছিল, তা জানতে কলেজ শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে টাইমস।
তারা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে করোনার কারণে পড়াশোনার ঘাটতি, পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, মুঠোফোনের অপব্যবহার এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ।
শহরের বাইরের এলাকাগুলোতে শিক্ষক সংকট ও পাঠদানের মান ভালো না থাকার মতো পুরোনো সমস্যাগুলো অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে সরকার গত দুই বছর ধরে বলে আসছে, খাতা দেখার নিয়ম কঠোর করায় পাসের হার কমেছে। এ বছর কোনো গ্রেস মার্ক বা বাড়তি নম্বর দেওয়া হয়নি; ফলে কোনো শিক্ষার্থী একটা বিষয়ে মাত্র এক-দুই নম্বরের জন্য পিছিয়ে পড়লেও পাস করতে পারেনি।
তবে সরকারের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন কঠিন হওয়া বা কড়াভাবে খাতা দেখা—যাই বলুন না কেন, কোনোভাবেই ফেল মেনে নেওয়া যায় না। একজন শিক্ষার্থী তো টেস্ট পরীক্ষায় পাস করে, ফরম পূরণ করে, তারপর আরও তিন মাস প্রস্তুতি নেয়। তাহলে বোর্ড পরীক্ষায় সে এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করে কীভাবে?’
এ বছর সারা দেশে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৬৩ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন, অর্থাৎ পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
এর আগে এর চেয়ে কম পাসের হার দেখা গিয়েছিল ২০০৪ সালে, সেবারও বিএনপি সরকারের আমলেই পরীক্ষার্থীদের ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ পাস করেছিল।
এবারের পাসের হার গত বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ কম। আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৬৯ হাজার ৯৭ জন থেকে কমে নেমে এসেছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই খারাপ ফল মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ফলাফল আমাদের সন্তুষ্ট করার মতো হয়নি। মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলো মিলে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবে।’
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, পরীক্ষার ফলাফলে গত দুই বছরে নেওয়া নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘যদি মেধার সঠিক মূল্যায়নের এই ধারা ধরে রাখা যায়, তবে পাসের হার ধীরে ধীরে বাড়তির দিকে যাবে।’
মহামারি রেখে গেছে পড়াশোনার স্থায়ী ঘাটতি
২০২০ সালে যখন করোনা মহামারি শুরু হয়, তখন এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়ত ষষ্ঠ শ্রেণিতে। সে সময় টানা ৬৬ দিনসহ মোট ১২০ থেকে ১২৫ দিন লকডাউন ছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল প্রায় দেড় বছর। ২০২০ সালে বার্ষিক পরীক্ষাই বাতিল করা হয়। পরের বছর শিক্ষার্থীরা শুধু বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ গণিত বিষয়ে পরীক্ষা দেয়।
অনলাইন ক্লাস দিয়ে পড়াশোনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গবেষণায় দেখা গেছে, গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো সেই ক্লাসে অংশ নিতে পারত না।
শিক্ষাবিদরা আগেই সতর্ক করেছিলেন পড়াশোনার এই ব্যবধান বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনবে। কিন্তু সরকার তা সামাল দিতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান জানান, করোনার ধাক্কা পুরোপুরি সামলে ওঠার আগেই শিক্ষার্থীদের সামনে আসে আরেকটি বড় বাধা।
তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই তাদের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও তার পরের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। এসব ঘটনাও তাদের পড়াশোনার ভীষণ ক্ষতি করেছে।’
এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে, মানুষের আয়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে জিনিসপত্রের দাম।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত চার বছরে অন্তত ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, প্রকৃত আয় কমে যাওয়া ও কাজের সুযোগ না থাকায় ঝুঁকির মুখে রয়েছে আরও ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী জানান, মানুষের পকেটে টাকা না থাকায় পরিবারগুলো সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার আগের মতো পড়াশোনার পেছনে খরচ করতে পারছে না। আর্থিক অনটনে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে কাজ বেছে নিচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারগুলোও পড়াশোনার দিকে আগের মতো নজর দিতে পারছে না।’
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি, গণিত কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোর জন্য মূলত প্রাইভেট টিউশন বা কোচিংয়ের ওপরই বেশি ভরসা করে। কারণ ক্লাসরুমে এসব বিষয়ে সব সময় ভালো পড়ানো হয় না। তাই পরিবারের শিক্ষাব্যয় কমে গেলে পরীক্ষার প্রস্তুতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় এই ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়েই সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে।
ক্যাম্পাসের অস্থিরতার প্রভাব পড়ায়
শিক্ষার সিলেবাস বা পাঠ্যক্রমে ঘন ঘন পরিবর্তন পড়াশোনার ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালে নতুন কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম চালু করে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করে হঠাৎ করেই আবার ২০১২ সালের পুরনো সিলেবাসে ফিরে যায়।
যে শিক্ষার্থীরা এমনিতেই পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার লড়াই করছিল, তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত আরও বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অভ্যুত্থানের পর অন্তত দেড় বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো স্থিতিশীলতা ছিল না। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু শিক্ষার্থীর মনে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে শিক্ষকদের বেশ কষ্ট করতে হয়েছে।
ওই সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে তাদের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেনস্তা করা, আটকে রাখা এবং জোর করে পদত্যাগ করানোর মতো ঘটনাও ঘটে। কোথাও কোথাও শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা, কান ধরে ওঠবস করানো কিংবা গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর মতো লজ্জাজনক ঘটনাও ঘটে।
এই ঘটনাগুলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার সম্পর্কটাকে দারুণভাবে ভেঙে দেয়।
শিক্ষকরা জানান, অনেক শিক্ষার্থী মাসের পর মাস ক্লাসে আসেনি; পড়াশোনার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহই ছিল না। এ ছাড়া শিক্ষকদের ক্লাসে অনুপস্থিত থাকাও পড়াশোনায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোড় কামরুজ্জামান জানান, শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘গত দুই বছরে আমরা অভিভাবকদের নিয়ে সভাসহ নানা উদ্যোগ নিয়েও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে পারিনি। পড়াশোনার প্রতিও তাদের মনোযোগ ছিল খুবই কম।’
পাশের মিঠামইন উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবদুল গানিও প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘আগের ব্যাচগুলোর তুলনায় এবারের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় অনেক কম আগ্রহ দেখিয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শিক্ষক ক্লাসে শৃঙ্খলা ধরে রাখার কষ্টের কথা শোনান। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কিছু বলতে গেলেও এখন আমাদের ভয় হয়। ওরা উল্টো রাগ দেখায়, কোনো কথা শুনতে চায় না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোহাম্মদ আলী জিন্না এই পরিস্থিতির জন্য আন্দোলনের পরের পরিবেশকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, ‘আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ওপর ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। চারপাশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এরপর শুরু হলো মব কালচার বা দলবদ্ধ হেনস্তা, পড়াশোনা থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে সরে যাওয়া এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দূরত্ব বেড়ে যাওয়া। এই সবকিছু মিলে পড়াশোনার বারোটা বাজিয়েছে।’
সোশ্যাল মিডিয়া ও শর্টকাট পড়ার প্রবণতা
শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তারা এর জন্য অতিরিক্ত মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে শর্টকাট খোঁজার বদভ্যাসকে দায়ী করেন।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শফিকুল ইসলাম মনে করেন, মোবাইল ফোনের আসক্তি এবং অভিভাবকদের নজরদারির অভাব এর জন্য বড় দায়ী।
নওগাঁর মান্দার চাকুলী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক বেলাল হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এখন অন্য দিকে বেশি মজে আছে। পড়াশোনার চেয়ে মোবাইল আর সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে মেতে থাকতেই ওরা বেশি পছন্দ করে। এটা ওদের পরীক্ষার প্রস্তুতিকে পুরোপুরি মাটি করে দিয়েছে।’
নওগাঁ সরকারি মহিলা কলেজের সহযোগী আশরাফুল আলম জানান, পরীক্ষার্থীরা মূল বই ভালো করে পড়ার চেয়ে গাইডবই আর শর্টকাট পদ্ধতির ওপর ভরসা করে। যার ফলে পরীক্ষায় গিয়ে তারা ভালো নম্বর তুলতে পারে না।
মাগড়ার বাঁশশ্রী রবীন্দ্র স্মরণী কলেজের শিক্ষক আশীষ কুমার বিশ্বাসও মনে করেন, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে শর্টকাটে পড়ার ঝোঁক শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক শাকের আহমেদ চৌধুরী খারাপ ফলের পেছনে ডিজিটাল মাধ্যমের অতি ব্যবহার, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, গাইডবই আর কোচিং নির্ভরতাকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, ‘যারা অন্ধের মতো মুখস্থ না করে বিষয়গুলো বুঝে পড়েছে, গাইড বাদ দিয়ে মূল বই পড়েছে এবং যাদের ভিত শক্ত ছিল, কেবল তারাই ভালো ফল করেছে।’
সুযোগের বৈষম্য তৈরি করেছে বড় ফারাক
সারা দেশে ফলাফল খারাপ হলেও ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বরাবরের মতো এবারও ভালো ফল ধরে রেখেছে।
উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোর চেয়ে জেলা সদরের সরকারি কলেজগুলোর ফল তুলনামূলক ভালো হয়েছে, যা শিক্ষার সুযোগে বড় ধরনের বৈষম্য ফুটিয়ে তুলেছে।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গুরুদয়াল সরকারি কলেজে পাস করেছে ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী।
অথচ করিমগঞ্জ সরকারি কলেজে পাসের হার ৫৮ শতাংশ, কটিয়াদী উপজেলা সরকারি কলেজে ৫১ শতাংশ এবং মিঠামইনের হাওর অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হক সরকারি কলেজে পাসের হার মাত্র ৩৪ শতাংশ।
বোর্ডগুলোর ফলাফলেও এই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশি ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ পাসের হার এসেছে ঢাকা বোর্ড থেকে, আর সবচেয়ে কম ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ পাসের হার ছিল বরিশাল বোর্ডে।
তবে দেশের বাইরের পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর ভালো ফলাফলের রেকর্ড আগের মতোই অক্ষুণ্ণ আছে। ২০০১ সাল থেকে এই কেন্দ্রগুলোতে পাসের হার কখনো ৮২ শতাংশের নিচে নামেনি এবং টানা ১৬ বছর ধরে তা ৯০ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্না বলেন, সব জায়গায় শিক্ষকদের মান বা সুযোগ-সুবিধা একরকম নয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা সমান না থাকায় সবাই সমানভাবে পড়ার সুযোগও পায়নি। এসব বিষয় ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান শিক্ষকদের দুর্বল মান, পর্যাপ্ত ট্রেনিং না থাকা এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাবের কথা তুলে ধরেন।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, সিলেবাস নামমাত্র শেষ করা হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের ভালো কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাই নেই। শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নিতে পারেন না। আর শেষ কথা হলো, শিক্ষকরা খুবই কম বেতন ও সুবিধা পান বলে পেশার প্রতিও তাদের মনোযোগ থাকে না।’
শিক্ষক সংকটকে খুব গুরুতর সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি জানান, ভালো মেধার অধিকারীরা এখন আর এই পেশায় আসতে চাইছে না। এ ছাড়া শিক্ষকতার চাকরি পাওয়ার পরও শেখার বা প্রশিক্ষণের সুযোগ খুব সীমিত।
এই দুর্বলতাগুলো দূর করতে না পারলে সামনেও এমন খারাপ ফল দেখার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী যেসমস্ত কলেজে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে, সেগুলোর কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ভালো কলেজগুলোতে যদি ৯৮-৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করতে পারে, তবে কিছু প্রতিষ্ঠানে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ফেল করবে কেন? এমন পরিস্থিতির জন্য তো জবাবদিহি থাকা দরকার। আমি একজন শিক্ষক, মাস শেষে বেতন তুলছি, অথচ আমার ছাত্ররা ফেল করছে আর আমার কোনো দায় নেই—এমন শিক্ষাব্যবস্থা কোনোভাবেই চলতে পারে না।’
(এই প্রতিবেদন তৈরি করতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন কিশোরগঞ্জ থেকে রকিবুল হাসান রোকেল, কুমিল্লা থেকে মাজফিজ নান্টু, জামালপুর থেকে সাইমুম সাব্বির শোভন এবং নওগাঁ থেকে রিফাত হোসেন সবুজ)


