দুর্গাপূজা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতিফলন

দুর্গাপূজা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতিফলন
ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শেষে দেবী দুর্গা কৈলাসে ফিরে গেছেন। আর এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে শেষ হলো এক শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও আনন্দের উৎসব। হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বর্ষপঞ্জির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসবটির জন্য বাংলাদেশ সব সময় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। দুর্গাপূজা আমাদের শেখায়—অসত্যের ওপর সত্যের জয় হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীর সব মানুষের কল্যাণ হয়। মানবতা ও ঐক্যের এই শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানবজাতিকে ভালোবাসতে ও এক হয়ে থাকতে শেখায়।

এবারের দুর্গাপূজায় পুরো দেশজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। সাপ্তাহিক ছুটিসহ পাঁচ দিনের দীর্ঘ ছুটি ঢাকা শহরকে যেন ঈদের ছুটির আমেজ এনে দিয়েছিল।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের চেয়ে প্রায় দেড় হাজারটি বেশি মণ্ডপসহ এবার সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপ হয়েছিল। এর মধ্যে কেবল ঢাকা শহরেই ছিল ২৫৮টি মণ্ডপ। পূজা যেন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আনসার ও ভিডিপি, পুলিশ, এসআরবি, এপিবিএন, বিজিবি এবং কোস্ট গার্ডের বিপুল সদস্য মোতায়েন করা হয়। ব্যবহার করা হয় ড্রোন ও বিশেষ যানবাহন। দেওয়া হয় সরকারি অনুদান এবং অতিরিক্ত ছুটি। গত বছরের মতো কোনো বিশৃঙ্খলা এবার ছিল না। সরকারের সহযোগিতায় সার্বিক আয়োজন ছিল এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ দেশের প্রধান প্রধান কয়েকটি মণ্ডপ ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দুর্গাপূজা সার্বিকভাবে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু খবরের কারণে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি জানায়, উৎসব শুরু হওয়ার ঠিক আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর, চুরি ও ছোটখাটো সংঘাতের মতো প্রায় ৩৪টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশের তদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে একেবারেই ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। দেখা যায়, এই ঘটনাগুলোর মূল কারণ ছিল বিভিন্ন পূজা কমিটির নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্ব, যা মূলত মন্দির পরিচালনা এবং সরকারি বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি থেকে তৈরি হয়েছিল।

এ ছাড়া কুখ্যাত চোরদের চুরি এবং মানসিক ভারসাম্যহীন কিছু মানুষের কর্মকাণ্ডও এর পেছনে দায়ী ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, এসব ঘটনার সঙ্গে কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বা ধর্মীয় স্বাধীনতায় বাধা দেওয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাই এসব ঘটনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চক্রান্ত চলছে বলে যে প্রচার করা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

তবে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, পুলিশ, ড্রোন এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কড়া পাহারায় পূজা পালন করা বেশ লজ্জাজনক। তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে বলে, কঠোর নিরাপত্তার কারণে একটি উৎসব হয়তো শান্তিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ মনের দিক থেকে পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছেন। কাল্পনিক বা রাজনৈতিক গল্পের চেয়ে বাস্তব প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই পরিস্থিতিকে দেখা উচিত। একই সাথে, বিচ্ছিন্ন হলেও এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে এবং জড়িতদের পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

আরও পড়ুন

২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, স্থানীয় অস্থিতিশীলতা এবং বন্যা দুর্গতদের সহায়তায় নজর দেওয়ার কারণে মণ্ডপের সংখ্যা কিছু কমেছিল এবং নিরাপত্তা বাড়াতে হয়েছিল। ফলে এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই পূজা উদযাপিত হয়। এত কিছুর পরও ফরিদপুর, খুলনা, কিশোরগঞ্জ, রাজবাড়ি ও চট্টগ্রামের মতো কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন কিছু গোলযোগ ঘটে, যার পেছনে ২০২১ সালের বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটা ধাক্কা এখনো রয়ে গেছে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, পরিস্থিতি এখনো সংবেদনশীল। নিরাপত্তার বিষয়ে একটু ঢিলেঢালা ভাব দেখালেই আবার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। তাই প্রশাসনিক ও সামাজিক নজরদারি সব সময় বজায় রাখা দরকার। তবে বিশিষ্ট সমাজসেবকরা এ বছরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এবং ভবিষ্যতের উৎসবগুলোতে এটি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, এ বছরের পূজা আগের বছরগুলোর চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। সব দিক থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি সবাইকে সাহস জুগিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ জানান, পূজা শুরুর আগে কিছু ঝামেলা হলেও মূল উৎসব একদম শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) কামরুন মুনিরা জানান, বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই পূজা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যেন এ বছরের ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি আগামী দিনের জন্য একটি স্থায়ী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। বড় কোনো উৎসব শুরু হওয়ার আগেই নিরাপত্তা পরিকল্পনা করতে হবে। সারা বছরজুড়েই গোয়েন্দা নজরদারি, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বয় রাখতে হবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্ত হতে হবে একদম নিরপেক্ষ ও সঠিক সময়ে। পাশাপাশি, অযথা কারও যুক্তিসংগত অভিযোগ বা সমালোচনা বন্ধ না করে, যারা গুজব ছড়িয়ে ঘৃণা ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা, বিদ্বেষ ছড়ানো বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে ঝামেলা তৈরি করা থেকে তাদের বিরত থাকতে হবে।

সরকারকে যেমন সবার জন্য আইনের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সাধারণ নাগরিকদেরও ধর্মীয় ভেদাভেদ সৃষ্টিকারী সব উসকানি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। দুর্গা পূজা মূলত আমাদের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং বিপদে পড়া মানুষের পাশে থাকতে শেখায়। আমাদের মতাদর্শ বা ধর্ম আলাদা হতেই পারে, কিন্তু মানবতা আর ঐক্যই যেন হয় আমাদের মূল শক্তি।

১৯৭১ সালে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের যৌথ ত্যাগের মধ্য দিয়েই আজকের বাংলাদেশের জন্ম। এই দেশের মূল ভিত্তিই হলো ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। আমাদের এই বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণ সবাইকে সব সময় একসাথে কাজ করে যেতে হবে।

লেখক: ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের ডেপুটি এডিটর

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad