গত সপ্তাহে সৌদি আরবে যে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাদের বাঁচাতে জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কোনো কর্মকর্তা সামান্য চেষ্টাও করেননি। বিপদের সময় আইনি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসী কূটনীতিকদের চরম অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার চিত্রটি আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, দুই নাগরিক যে কারাগারে আটক আছেন, তা মিশন কর্মকর্তারা জানতেন। তবে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দিতে তাদের চরম ব্যর্থতার কারণেই মূলত এত দ্রুত এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক কূটনীতিক টাইমসকে বলেন, ‘কোনো রকম দেরি না করে ওই সময়ই যদি সৌদি সরকারের সঙ্গে কথা বলা হতো, তবে মৃত্যুদণ্ড হয়তো স্থগিত করা যেত। এমনকি আদালতের রায়ও বদলে যেতে পারত।’
সাইবার অপরাধ ও অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে দীর্ঘ তিন বছর বিচার চলার পর গত সপ্তাহে জেদ্দায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামের ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মিশন কর্মকর্তারা একটু চেষ্টা করলেই তাদের খুঁজে বের করে আইনি সহায়তা দিতে পারতেন; সেই সময়ও তাদের হাতে ছিল।
সৌদি মিশন ও মন্ত্রণালয়ে কাজ করে আসা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কারাগার থেকে পাঠানো কয়েদিদের তালিকার মাধ্যমে তাদের অপরাধের কথা আমাদের জানিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। তবে সেখানে যে সাজা চূড়ান্ত হয়ে গেছে বা সাজাটা কী, তা বলা ছিল না।’
সৌদিতে কাজ করে আসা মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা জানান, মিশনের শ্রম উইংয়ে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারা সাধারণত সৌদি বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে ভালোই জানেন। এ ধরনের অপরাধের শেষ পরিণতি যে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, সেটাও তাদের অজানা নয়। কিন্তু এরপরেও তারা মামলার বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো চেষ্টাই করেননি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর কয়েদিদের একটি সাধারণ তালিকা জেদ্দা মিশনে পাঠায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। সেই তালিকায় নজরুল ও সুইটির নাম ছিল। সেখানে সাইবার অপরাধ ও অনৈতিক সম্পর্কের কথা বলা থাকলেও তাদের যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার উল্লেখ ছিল না।
জেদ্দায় রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মিশন, যেখানে ১০০ জনেরও বেশি কর্মী কাজ করেন। সেখানকার শক্তিশালী শ্রম উইংয়ের মূল কাজই হলো বিপদে পড়া প্রবাসীদের আইনি সহায়তা দেওয়া।
বর্তমানে সৌদি আরবে থাকেন প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি। গত বছরও তারা প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। প্রবাসীদের পাঠানো এই টাকায় দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরলেও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে তারা প্রায়ই অবহেলার শিকার হন।
সময়মতো একটু উদ্যোগ নিলে যে দুটি প্রাণ বেঁচে যেতে পারত, কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে সেই দুই বাংলাদেশির এই নির্মম পরিণতি তারই এক করুণ উদাহরণ।
একইভাবে ঢাকায় সরকারের ভূমিকাও বেশ হতাশাজনক।
সরকার বারবার বলছে, তারা রিয়াদের কাছ থেকে আইনি নথিপত্র চেয়েছে। তবে জেদ্দা বা রিয়াদের অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে কি না, কোনো তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—তা পরিষ্কার করেনি।
শুধু ‘নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে’ না বলে পুরো বিষয়টি নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিবিদ এই ঘটনাকে দায়িত্বহীনতা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘এটি চরম অবহেলা ও গাফিলতি। সৌদি কর্তৃপক্ষ অপরাধের কথা জানানোর পরপরই মিশন কর্মকর্তাদের তৎপর হওয়া উচিত ছিল। এগুলো তো সাধারণ অপরাধ নয়, এর সর্বোচ্চ সাজা যে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে তা সবার জানা।’
আইনি সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ‘একজন কূটনীতিক বা শ্রম কাউন্সিলরকেও কি জবাবদিহির আওতায় আনা হলো না? কাউকে দেশে ফিরিয়ে আনা হলো না কেন–প্রশ্ন তুলে ওই সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘এভাবে একের পর এক ছাড় দিতে থাকলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘটবে। কারণ, কনস্যুলার সেবার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বুঝে গেছেন, কাজ না করলেও তাদের কিছুই হয় না।’
জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই বাংলাদেশিই সৌদি আরবের ‘আল মাজাল’ নামের একটি সংস্থায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। সাইবার অপরাধের অভিযোগে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে তার পরদিন সুইটিকে আটক করে পুলিশ।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মক্কার একটি মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট করার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার, তদন্ত ও বিচার করা হয়েছিল। বিচারিক আদালত তাদের এই গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে এবং রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করা হয়।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান সরকারের এই ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন। টাইমসকে তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের এভাবে সুরক্ষা দিতে না পারলে বিদেশি সরকারগুলো ভাববে—বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে যেকোনো কঠিন পদক্ষেপ নিলেও ঢাকা থেকে জোরালো কোনো প্রতিবাদ আসবে না।
তিনি বলেন, ‘সরকারের উচিত এই ব্যর্থতার দায় নেওয়া। একই সঙ্গে অপরাধী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়া দরকার। সেই সঙ্গে বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া উচিত, বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর যেমন খুশি তেমন বিচার বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।’


