মৌসুমের কৃষিপণ্য কিনতে শরীয়তপুরের জাজিরা থেকে রাজশাহীর তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন পাঁচ ব্যবসায়ী। পথে নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তারা।
নিহত পাঁচ ব্যবসায়ী হলেন জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর মাদবরকান্দি এলাকার জহির উদ্দিন মাদবরের ছেলে জুয়েল মাদবর (৪০), ডুবিসায়বর মোল্লাকান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে শালাল মোল্লা (৪৫), ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), ডুবিসায়বর এলাকার ব্যবসায়ী আরব আলী ফকিরের ছেলে সামাদ ফকির (৬৫) এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার রাজ্জাক বেপারীর ছেলে শাহিন বেপারী (৩০)।
তারা দীর্ঘদিন ধরে জাজিরার কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকায় ব্যবসা করতেন। মৌসুমের শুরুতে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন তারা। এবারও সেই উদ্দেশ্যেই রাজশাহীর তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে যায় তাদের যাত্রা।
মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, বরিশাল থেকে রাজশাহীগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
নিহতদের মধ্যে জুয়েল মাদবর কাঁচামালের ব্যবসার পাশাপাশি কাজিরহাটে রড ও সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকির ছিলেন কাঁচামাল ব্যবসায়ী। শাহিন বেপারী হলুদ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শালাল মোল্লা ও সোহাগ শিকদারও বিভিন্ন পণ্য কেনাবেচা করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জুয়েল মাদবরের বড় ভাই শাহজাহান মাদবর জানান, আগের রাতে জুয়েল তাকে ফোন করে ব্যবসার কাজে নাটোর যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কোথা থেকে বাসে উঠবেন, সেটিও বলেছিলেন। কিন্তু সকালে ফোনে তিনি জানতে পারেন, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর ভাই।
শালাল মোল্লার বড় ভাইয়ের স্ত্রী নাছিমা বেগম বলেন, ‘ব্যবসার মালামাল কিনতে গতকাল সোমবার নাটোরে যান আমার দেবর। তার সঙ্গে ব্যবসার আরও কয়েকজন ছিলেন। আজ সকালে নাটোর থেকে এক দারোগা ফোন করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় আমার দেবর মারা গেছেন। খবরটি শুনে আমরা ভেঙে পড়েছি। তার ৫ মেয়ে ২ ছেলে রেখে গেছে, ওরা এখন কেমনে চলবে।’
নিহত সোহাগ শিকদারের বাবা ইউনুস শিকদার জানান, তার পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে। দুই ছেলের মধ্যে সোহাগ বড়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন তিনি। ইউনুস শিকদার একসময় ছোটখাটো ব্যবসা করলেও এখন কোনো কাজ করতে পারেন না।
তিনি বলেন, ‘ওরা কয়েকজন মিলে একসঙ্গে পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, ধনিয়াসহ সিজনাল ব্যবসা করত। সোমবার সন্ধ্যায় তারা একসঙ্গে পেঁয়াজ কেনার জন্য নাটোর যায়। আজ সকাল ৮টার দিকে ওই এলাকার থানার ওসি ফোনে দুর্ঘটনার খবর দেন।’
নিহত সোহাগের মায়ের আহাজারির মতো অন্য ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। কেউ হারিয়েছেন ভাই, কেউ স্বামী, আবার কেউ পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যকে।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সালেহ আহম্মেদ বলেন, নাটোরের সড়ক দুর্ঘটনায় জাজিরার পাঁচজন মারা গেছেন। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ আনতে গেছেন। এর মধ্যে জুয়েল মাদবরের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছেছে। তাকে রাতেই দাফন করা হবে বলে তিনি শুনেছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সকালে দুর্ঘটনার পর নাটোরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও বড়াইগ্রামের ইউএনও প্রাথমিকভাবে ১৪ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে রাতে ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘সকালে ১৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হলেও সন্ধ্যা নাগাদ তারা নিশ্চিত হয়েছেন নিহতের সংখ্যা ১২ জন। সবার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’


