জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই, তাঁর জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন করি, তাঁর কবিতা আবৃত্তি করি, গান গাই। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার বাইরে একটি জরুরি প্রশ্ন থেকেই যায়: নজরুলের যে মানবতা, সাম্য, প্রতিবাদ ও মুক্তির দর্শন আমাদের এত অনুপ্রাণিত করে, তা আমাদের ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় কতটা প্রতিফলিত হয়? কবিকে স্মরণ করার প্রকৃত অর্থ কি কেবল তাঁর জন্মদিন পালন, নাকি তাঁর আদর্শকে দৈনন্দিন জীবনের চর্চায় রূপ দেওয়া?
২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ এই প্রশ্নটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। এমন আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। তবে কোনো স্মরণোৎসবের সার্থকতা তার জাঁকজমকে নয়, বরং তা আমাদের চিন্তা ও আচরণে কতটা স্থায়ী পরিবর্তন আনে, তার ওপর নির্ভর করে। অনুষ্ঠান শেষ হলে যদি আমরা আগের মতোই বৈষম্য, অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করি, তবে কবিকে শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা তাঁর আদর্শ ধারণের বিকল্প হতে পারে না।
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন, জীবনানন্দ দাশ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ বহু কালজয়ী স্রষ্টা নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল। তাঁদের প্রত্যেকের অবদান স্বতন্ত্র। তবু জাতীয় জীবনে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা বিশেষভাবে অনিবার্য, কারণ তিনি মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও নৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। সময় বদলেছে, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামো বদলেছে; কিন্তু লোভ, ক্ষমতার দম্ভ, বৈষম্য, বিভেদ, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা এবং অন্যায়ের প্রবণতা কি বিলুপ্ত হয়েছে? হয়নি। এ কারণেই নজরুল কেবল অতীতের কবি নন; তিনি আমাদের বর্তমানেরও প্রশ্নকর্তা।
নজরুলের সাহিত্যজগতের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ—তার মর্যাদা, অধিকার, বেদনা, সম্ভাবনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে: “গাহি সাম্যের গান— / যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান… / যেখানে মিশেছে হিন্দু, বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।” এই সাম্য কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি এমন এক নৈতিক অবস্থান, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, শ্রেণি কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে মানুষ।
‘মানুষ’ কবিতায় নজরুলের অমোঘ উচ্চারণ—“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”—আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। আবার ‘সাম্য’ কবিতায় ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে ওঠার যে আহ্বান, তা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মর্যাদাবোধই ধর্মীয় এবং নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা। তাঁর মানবতাবাদ সমাজের প্রান্তিক মানুষকেও সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। শ্রমিক, কৃষক, কুলি, মজুর—যাঁদের শ্রমে সমাজ সচল থাকে, তাঁদের জীবন ও বঞ্চনাকে তিনি দৃশ্যমান করেছেন।
নারীর মর্যাদা ও অবদান সম্পর্কেও নজরুলের অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। ‘নারী’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: “সাম্যের গান গাই— / আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!” এবং “বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” নারীকে অধস্তন করে রাখা, তাঁর অবদানকে খাটো করা কিংবা সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে এই উচ্চারণ আজও প্রাসঙ্গিক। সাম্য প্রতিষ্ঠার দাবি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বাস্তব রূপ পায়।
নজরুলের মানবতাবাদ ও সামাজিক ন্যায়বোধের গভীরতা বোঝার জন্য ‘কৃষকের ঈদ’ এবং ‘ঈদের চাঁদ’ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ঈদ আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের উৎসব। অথচ যে কৃষক ফসল ফলিয়ে মানুষের অন্ন জোগান, তাঁর নিজের ঘরেই যদি অনটন ও বঞ্চনা থেকে যায়, তবে উৎসবের আনন্দ কতটা সর্বজনীন? ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় নজরুলের প্রশ্ন—“জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ / মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?”—উৎসবের সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে আমাদের অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
একইভাবে ‘ঈদের চাঁদ’ কবিতায় কৃষক, মজুর ও শ্রমজীবী মানুষের প্রাপ্য অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা প্রতিবাদী ভাষা পেয়েছে। “মোদের হিস্সা আদায় করিতে ঈদে”—এই উচ্চারণ দয়ার দান নয়, ন্যায্য হিস্যার দাবি। এখানেই নজরুলের মানবতাবাদ নিছক আবেগের সীমা অতিক্রম করে অধিকার, মর্যাদা ও কাঠামোগত বৈষম্যের প্রশ্নে পৌঁছে যায়। তাঁর কবিতা আমাদের শেখায়, দরিদ্র মানুষের দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ যথেষ্ট নয়; কেন সেই দারিদ্র্য টিকে আছে, কেন উৎপাদকই বঞ্চিত হন, কেন সামাজিক সম্পদ ও সুযোগের বণ্টনে বৈষম্য থাকে—সেসব প্রশ্নও তুলতে হবে।
আজ আমরা এমন এক সময়ে নজরুলকে স্মরণ করছি, যখন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক সহিষ্ণুতার সংকটও দৃশ্যমান। যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়া কি একই হারে বেড়েছে? তথ্যের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু প্রজ্ঞা ও বিবেক কি সমানভাবে বিকশিত হয়েছে? আধুনিকতার বাহ্যিক উপকরণ অর্জন করলেই কি সমাজ সভ্য হয়ে ওঠে, নাকি মানুষের প্রতি আচরণ, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়েই সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়?
মুক্তবাজার অর্থনীতি, প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতায় মানুষকে কেবল উৎপাদনশীলতার একক বা অর্থনৈতিক ‘এজেন্ট’ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়তে পারে। দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মানুষকে শুধু শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের উপযোগী করে গড়ে তুললেই শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ হয় না। রাষ্ট্রের প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি, একই সঙ্গে প্রয়োজন দায়িত্বশীল নাগরিক, নৈতিকভাবে সচেতন মানুষ এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে সক্ষম মন। মানবসম্পদ ও নাগরিক—দুটি ধারণা পরস্পরসম্পর্কিত হলেও এক নয়।
এই জায়গায় সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও শিল্পচর্চার গুরুত্ব বিশেষভাবে সামনে আসে। এসব বিষয়ে শিক্ষা মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না; অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে, নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে, জটিল বাস্তবতা বিচার করতে এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য অনুধাবন করতে সাহায্য করে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রেও এ কথা সমান সত্য। দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও কর্মোপযোগিতা অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, দলগত কাজ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা জরুরি। দক্ষ কর্মী তৈরি করা প্রয়োজন; কিন্তু সেই কর্মী যেন একই সঙ্গে বিবেকবান মানুষ ও সচেতন নাগরিক হয়ে উঠতে পারেন, শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত সেটিও।
শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবতে গেলে তাই কেবল পরীক্ষার ফল, পেশাগত সাফল্য কিংবা কর্মবাজারে প্রবেশের সক্ষমতার হিসাব যথেষ্ট নয়। জ্ঞান অর্জন, প্রযুক্তিতে দক্ষতা এবং কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা—সবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সাফল্য আর সার্থকতা এক নয়। পেশাগত অর্জনের সঙ্গে মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও অন্যের প্রতি সম্মান না থাকলে সেই অর্জন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নজরুলের জীবন ও সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত বড়ত্ব কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যে নয়; অন্যায়ের সামনে অবস্থান নেওয়া এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার মধ্যেও নিহিত।
পড়া ও সাহিত্যচর্চার মূল্যও এখানেই। বইয়ের সব তথ্য মনে রাখা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু ভালো সাহিত্য পাঠকের অনুভব, বিচারবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিতে পারে। কোনো কবিতা আমাদের অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়, কোনো গল্প পরিচিত বাস্তবতাকে নতুন চোখে দেখতে সাহায্য করে, কোনো প্রবন্ধ আমাদের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে। পাঠের ফল তাই কেবল স্মৃতিতে সঞ্চিত তথ্য দিয়ে মাপা যায় না; তা মাপা যায় আমাদের চিন্তা, সংবেদনশীলতা ও আচরণে তার প্রভাব দিয়ে।
নজরুলের জন্মজয়ন্তী ও ‘নজরুল বর্ষ’ তখনই সার্থক হবে, যখন তাঁর কবিতার পঙ্ক্তি আনুষ্ঠানিক স্মরণ থেকে বেরিয়ে সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত হবে; যখন সাম্যের কথা বলার পাশাপাশি বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেওয়া হবে; যখন ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মধ্যে দেয়াল নয়, পারস্পরিক মর্যাদা ও সহাবস্থানের ভিত্তি হবে; এবং যখন শিক্ষার লক্ষ্য হবে দক্ষতার সঙ্গে মানবিকতার বিকাশও। নজরুলকে ভালোবাসার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তাঁর প্রতিকৃতি, পুষ্পস্তবক কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়—বরং তাঁর আদর্শের পক্ষে আমাদের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত ও কাজ।
আজ আমাদের প্রয়োজন এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক নবজাগরণ—যেখানে জ্ঞান আমাদের বিনয়ী করবে, শিক্ষা আমাদের দায়িত্বশীল করবে, আর সাহিত্য আমাদের আরও সংবেদনশীল মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করবে। নজরুলের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে সেই সমাজ গড়ার প্রয়াসে, যেখানে মানুষ পরিচয়ের বিভাজনে নয়, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচবে; যেখানে উন্নয়ন মানবিকতার বিকল্প হবে না; এবং যেখানে সাম্য কেবল কবিতার পঙ্ক্তিতে নয়, জীবনের বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠা পাবে।
লেখক: পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর


