ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় এক বিধবা নারীকে ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি ও টিপসই নেওয়ার পর বিয়ের কাবিননামায় সেই ছবি ও টিপসই ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই নারীর দাবি, তিনি কাউকেই বিয়ে করেননি। এমনকি বিয়ের কাজী, সাক্ষী কেউ স্বীকার করছেন না বিয়ের কথা। এনিয়ে দু’দিন সালিশ হলেও অভিযুক্তদের সাড়া মেলেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের বিধবা নারী আছিয়া বেগম (৪৩) জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেওয়া হয়েছিল। পরে একটি কাগজে তার টিপসই নেন স্থানীয় জামায়াতের সহযোগী সদস্য আবদুস ছাত্তার। সরকারি কার্ড তৈরির প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তিনি ওই টিপসই নিচ্ছেন বলে জানান।
কয়েক দিন পর বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকাজুড়ে হৈচৈ পড়ে যায়। এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, ওই নারীর নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। তাকে দেখানো হয় কাবিননামা ও এফিডেভিট। বর তারই পূর্বপরিচিত আবদুল কুদ্দুছ। কাবিননামায় আছিয়া বেগমের টিপসই থাকলেও তিনি দাবি করছেন, কোনো বিয়েতে তিনি উপস্থিত ছিলেন না, কাজির সঙ্গে তার দেখা হয়নি এবং বিয়েতেও তিনি সম্মতি দেননি।
আছিয়ার অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতের সহযোগী সদস্য আবদুস ছাত্তার ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তার টিপসই নিয়েছেন। সেই টিপসই ব্যবহার করে তার নামে বিয়ের কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে। আছিয়া বলেন, প্রায় ১৩ বছর আগে তার স্বামী আবু কালাম মারা গেছেন। এরপর দুই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। তার নাতি-নাতনিও রয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর দিনমজুরের কাজ করে সন্তানদের লালন-পালন করেছেন। বিভিন্ন সময় বিয়ের প্রস্তাব এলেও সন্তানদের কথা ভেবে তিনি আর বিয়ে করেননি।
সাংবাদিকরা আছিয়ার বাড়িতে গেলে তিনি জানান, প্রায় দেড় মাস আগে স্থানীয় জামায়াতকর্মী আবদুস ছাত্তার ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বললে সরল বিশ্বাসে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি দেন। পরে টিপসই দেওয়ার জন্য তাকে আবার ডেকে নেওয়া হয়। তিনি স্বাক্ষর করতে পারেন না বলে টিপসই দেন। পরে জানতে পারেন ওই টিপসই দিয়ে কাবিননামা তৈরি হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই নিয়ে এখন বলছে তার নাকি বিয়ে হয়ে গেছে! তিনি কোথাও বিয়ে করতে যায়নি বা কোনো কাজীর মুখোমুখি হননি।
বিধবা আছিয়াকে যিনি বিয়ে করেছেন বলে প্রচার হয়েছে তিনি আবদুল কুদ্দুছ। তার বাড়ি পাটুলী বাজারের পাশেই। তার বাড়ি গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে ছিলেন তার স্ত্রী সুফিয়া খাতুন, এক ছেলে, এক মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা। সুফিয়া খাতুন জানান, বুধবার সকাল থেকেই তার স্বামী বাড়িতে নেই। বিয়ের বিষয়ে স্বামী তাকে কিছু জানাননি। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর কুদ্দুছ তাকে বলেছেন, তিনি কোর্ট ম্যারেজ করেছেন। সুফিয়া বলেন, তাকে (কুদ্দুছ) বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তিনি কারও কথা শোনেননি।
এলাকায় ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় দেখা যায় পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি গোলাম মোস্তফা বিয়েটি সম্পন্ন করেছেন। দেনমোহর ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে আবদুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামের নাম রয়েছে। তবে সাক্ষী সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি কোনো কাবিননামার সাক্ষী হননি। যদি এমনটি হয়ে থাকে তাহলে দৃষ্টান্তমূলক বিচারও দাবি করেন তিনি।
বিয়ে সম্পন্ন করার অভিযোগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুঠোফোনে কাজি গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকদের জানান, তিনি ওই বিয়ে সম্পন্ন করেননি। কাবিননামার যে কাগজ ছড়িয়েছে, সেটি জাল।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আছিয়ার সঙ্গে আবদুল কুদ্দুছের আগে থেকেই পরিচয় আছে। আছিয়ার ছেলের বিয়ের সময় কুদ্দুছকে উকিল শ্বশুর করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে কুদ্দুছের পক্ষ থেকে আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি রাজি হননি। স্বামী মারা যাওয়ার পর কুদ্দুছ ছাড়াও আরও কয়েকজন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে সন্তানদের কথা বিবেচনা করে তিনি আর বিয়েতে রাজি হননি।
গত সোমবার ও বুধবার পাটুলী গ্রামে এ নিয়ে সালিশ বসে। সালিশের নেতৃত্ব দেন পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ রুস্তম আলী। তিনি জানান, আছিয়ার কাছে কাবিনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তাকে জানিয়েছেন, ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে তার টিপসই নেওয়া হয়েছিল।
কাবিননামায় থাকা সাক্ষীরাও সালিশে জানিয়েছেন, তারা বিয়ের বিষয়ে কিছুই জানেন না। তিনি আরও বলেন, ‘কীভাবে কী হলো, আমরা যাচাই করছি। সালিশের মাধ্যমে সমাধান না হলে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।’ তবে সালিশে অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুছ কেউই উপস্থিত ছিলেন না। পরে শুক্রবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে আবদুস ছাত্তার তার অবস্থান স্পষ্ট না করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে আছিয়ার কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবদুস ছাত্তার। তিনি পাটুলী বাজারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী এবং নিজেকে জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। আবদুস ছাত্তার বলেন, ‘আমি ওই মহিলার কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে কোনো টিপসই নেইনি। অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’
উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক (শামীম) সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাটি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে তিনি খোঁজ নিয়েছেন। তার দাবি, আবদুস ছাত্তার জামায়াতের নিয়মিত পদধারী কোনো নেতা নন। নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপি করতেন বলেও জানান তিনি।
ফজলুল হক বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীদের আইন অনুযায়ী বিচার হোক। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।’
ফুলবাড়ীয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাংবাদিকসহ বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঘটনাটি শুনছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি কতটুকু সত্য, নাকি ভিত্তিহীন এরও কোনো সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ ছাড়াতো পুলিশ কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে না। তবে ফ্যামিলি কার্ডের নাম করে কেউ প্রতারণা করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


