ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় বুধবার মধ্যরাত থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান’। এই অভিযানে টানা ২২ দিন নদী ও সাগরে সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এই সময়ে বেকার হয়েছেন জেলার লক্ষাধিক জেলে পরিবারসহ মৎস্যজীবীরা।
ইলিশ সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের সব নদী ও বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ শিকার বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুত সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।
নিষেধাজ্ঞার এক দিন আগে থেকেই বরগুনার পাথরঘাটার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, সদরের নদী বন্দর ও তালতলীর ফকিরহাট এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে সাগর দাপিয়ে বেড়ানো ট্রলার। সরকারের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে জাল-দড়ি গুছিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা।
বুধবার সকালে পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে নোঙর করেছে এফ বি আল্লাহর দান ট্রলার। এই ট্রলারের মাঝি ইয়াকুব আলী বলেন, ‘সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা মেনে আমরা ঘাটে ফিরে এসেছি। নিষেধাজ্ঞার এই ২২ দিন আমরা মাছ শিকার করব না। এখন জাল দড়ি গুছিয়ে নিচ্ছি, এরপর বাড়ি চলে যাব।’
সকাল গড়িয়ে দুপুর হতেই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে ভিড়তে শুরু করে একের পর এক ট্রলার। এসব ট্রলারের জেলেরা জানান, মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের এই উদ্যোগ সবাই মানবেন। তবে, অসাধু কোনো জেলেরা যেন নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ শিকার করতে না পারে সেই বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেন জেলেরা।
জেলে গোলাম রসুল, নজরুল মোল্লা, খোকনসহ একাধিক জেলেরা বলেন, সরকারের আইন যেন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হয়। গত বছর মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনে আমরা মাছ শিকার থেকে বিরত থাকলেও অসাধু জেলেরা মাছ শিকার করে মা ইলিশ ধ্বংস করেছে। এরপর নিষেধাজ্ঞা শেষে আমরা সাগরে গিয়ে মাছ পাইনি।
এফ বি ফরাজী ট্রলারের মালিক আবুল হোসেন ফরাজী বলেন, ‘আমরা এই ২২ দিন মাছ শিকার করব না। কিন্তু এই সময়ে অসাধু জেলেরা কৌশলে মা ইলিশ শিকার করলে নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে গিয়ে আমাদের গত বছরের মতো খালি হাতে ফিরতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সবাই সরকারের নিষেধাজ্ঞা মানলে নিষেধাজ্ঞা শেষে সব জেলেরাই সাগরে মাছ পাবে।
এদিকে জেলেদের অভিযোগ, দেশে নানামুখী সংস্কার মুখে শুনলেও বন্ধ হয়নি জেলেদের ভাগের চাল চুরির চর্চা। এবার আর নয়-ছয় নয় নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই জেলে প্রতি ২৫ কেজি করে সহায়তার চালের পুরোটাই চান তারা।
জেলে নুর মোহাম্মদ, শামীম হোসেন, এনায়েত হোসেনসহ একাধিক জেলেরা বলেন, সহায়তার সময় ইউপি সদস্যরা চাল চুরি করে ২৫ কেজির জায়গায় চাল দেয় ১৮ থেকে ২০ কেজি। আবার অনেকে সরকার নিবন্ধিত জেলে হওয়ার পরও সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। এসব দিকে সরকারের কড়া নজরদারির দাবি জানান তারা।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন শাটডাউন থাকবে দেশের ২য় সর্ববৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাট।
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক, জিএম মাসুদ শিকদার বলেন, বুধবার রাত ১২টা থেকে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ বেচা-কেনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। তাই জেলে ও মৎস্যজীবীদের আগেভাগেই জানানো হয়েছে ১২টা বাজলেই ২২ দিনের জন্য শাটডাউন করা হবে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র।
নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার আগেই বরিশাল বিভাগের মধ্যে পিরোজপুর জেলায় সহায়তার চাল বিতরণ শেষ হয়েছে দাবি করে মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশালের বিভাগীয় পরিচালক মো. কামরুল হাসান জানান, প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই গোটা বিভাগে সহায়তার চাল বিতরণ শেষ হবে। তবে, আইন লঙ্ঘন করে মাছ শিকারের চেষ্টা করলেই নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
তিনি আরও বলেন, সহায়তার চাল বিতরণে অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর অবস্থানে থাকার জন্য আগেই বলা হয়েছে। সরাসরি বিতরণ কাজে মৎস্য অধিদপ্তরের তদারকি না থাকলেও জেলেদের স্বার্থে প্রশাসনের সঙ্গে চাল বিতরণের বিষয়ে সমন্বয় করছেন তারা।
বরগুনায় সরকার নিবন্ধিত জেলে ৫২ হাজার থাকলেও বরাদ্দ এসেছে ৩৯ হাজার ৪৬৯ জনের। তবে, বেসরকারি হিসাবে জেলায় মোট জেলে এক লাখের ওপরে।
আরও পড়ুন: সাগরে ৫৮ দিনের মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা


