বেশি মুনাফার আশায় দীর্ঘদিন কোল্ড স্টোরেজে মজুত করে রাখা প্রায় ৩০ হাজার মণ আলু পচে নষ্ট হয়ে গেছে। মাদারীপুর বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত মাদারীপুর কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষিত এসব আলুর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পচে যাওয়া আলু এখন বিনামূল্যে গরুর খাবার হিসেবে কৃষক ও খামারিদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
কোল্ড স্টোরেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৫ সালের মার্চে এসব আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। প্রতি বস্তায় ৬০ কেজি করে প্রায় ২০ হাজার বস্তায় আলু রাখা হয়। সব আলুই কোল্ড স্টোরেজের মালিক মীর হাবিবুর রহমানের বলে জানিয়েছেন ব্যবস্থাপক আবদুল করিম।
তিনি বলেন, গত বছর আলুর বাজার ভালো না থাকায় মালিকপক্ষ আশায় ছিলেন, পরবর্তী সময়ে দাম বাড়লে আলু বিক্রি করে লাভ করবেন। কিন্তু বাজার প্রত্যাশা অনুযায়ী ভালো না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আলুগুলো সংরক্ষণ করে রাখা হয়। একপর্যায়ে আলুর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায় এবং বস্তা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে।
আবদুল করিম বলেন, ‘গত বছর আলুর বাজার ভালো না থাকায় মালিকপক্ষ ঝুঁকি নিয়ে আলুগুলো রেখে দিয়েছিলেন, যদি এ বছর বাজার ভালো হয়। কিন্তু এ বছর বাজার আরও খারাপ থাকায় সেগুলো আর বিক্রি করা হয়নি। দীর্ঘদিন স্টোরেজে থাকার কারণে আলুগুলোর টেম্পারেচার নষ্ট হয়ে গেছে। খোলা জায়গায় ফেললে জনদুর্ভোগের আশঙ্কা থাকায় এখন এসব আলু বিনামূল্যে খামারি ও কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।’
কোল্ড স্টোরেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, গত দুই দিন ধরে পচে যাওয়া আলু স্থানীয় কৃষক ও খামারিদের মধ্যে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। তবে বস্তা থেকে বাছাই করে কিছুটা ভালো থাকা আলু গবাদিপশুর খাবার হিসেবে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয়রা।
নষ্ট আলু নিতে আসা রাস্তি ইউনিয়নের বাসিন্দা আলী আহমাদ বলেন, ‘এই আলু তো মানুষ খাবে না। এর মধ্যে থেকে বেছে যতটুকু ভালো আলু পাওয়া যাবে, সেগুলো আমরা গরুর জন্য নিতে এসেছি।’
এভাবে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আরও কয়েকজনও জানান, তারা মূলত গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহারের জন্য নষ্ট আলু সংগ্রহ করতে এসেছেন।
আলু নষ্ট হওয়ার কারণ সম্পর্কে কোল্ড স্টোরেজের মালিক মীর হাবিবুর রহমান বলেন, বিষয়টি তিনি এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি। তবে প্রাথমিকভাবে কোল্ড স্টোরেজের ভেতরে কোনো ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত হতে ঢাকা থেকে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ লোকজন এনে কোল্ড স্টোরেজ পরীক্ষা করানো হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আলু নষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
এদিকে, বিপুল পরিমাণ আলু দীর্ঘদিন মজুত করে রাখার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় আলু ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, মাদারীপুরে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষিত থাকার পরও বাজারের চাহিদা মেটাতে তাদের অন্য জেলা থেকে আলু কিনে আনতে হয়েছে। এতে পরিবহনসহ আলু সংগ্রহের খরচ বেড়েছে।
মাদারীপুরের আড়তদার খবরউদ্দিন বলেন, ‘ওই আলু ভালো থাকার সময় বাজারে বিক্রি করে দিলে কিছুটা হলেও আমাদের দূর-দূরান্তের জেলা থেকে ট্রাকভর্তি আলু আনা কম লাগত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেশি মুনাফার আশায় আলু মজুদ করে রাখা হয়েছিল। এখন সবই লোকসানে পরিণত হলো।’
অন্যদিকে, মাদারীপুর কৃষি বিপণন কর্মকর্তা রুবেল মিয়া বলেন, মাদারীপুর কোল্ড স্টোরেজ পরিদর্শন করে বিষয়টি বিস্তারিত জানা হবে। কেন এত বিপুল পরিমাণ আলু দীর্ঘদিন মজুত করে রাখা হয়েছিল এবং কী কারণে সেগুলো নষ্ট হয়েছে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে।
কোল্ড স্টোরেজে নষ্ট হয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ আলু নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। একদিকে কয়েক কোটি টাকার আলু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন মালিক, অন্যদিকে দীর্ঘদিন মজুতের কারণে স্থানীয় বাজারে এর কোনো সুফল না পাওয়ার অভিযোগ করছেন ব্যবসায়ীরা।


