সিরাজগঞ্জে মাচায় মাচায় লাউ, বিষমুক্ত চাষে কৃষকের মুখে হাসি

সিরাজগঞ্জে মাচায় মাচায় লাউ, বিষমুক্ত চাষে কৃষকের মুখে হাসি
মাচায় ঘুলছে লাউ। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের আঙিনা ও খেতের জমিতে এখন দেখা মিলছে মাচায় দুলতে থাকা সবুজ লাউগাছের। বাতাসে দোল খাচ্ছে লাউয়ের পাতা, আর তার ফাঁক গলে ফুটে উঠছে ছোট ছোট সাদা ফুল। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেন জানান দিচ্ছে-এসে গেছে নতুন ফসলের মৌসুম।

এ বছর সিরাজগঞ্জে লাউয়ের ভালো ফলন হয়েছে। মাচায় মাচায় ঝুলছে ছোট-বড়-মাঝারি কচি লাউ। যেদিকে চোখ যায়, কেবল লাউয়ের ছড়াছড়ি। স্বল্প জমিতে তুলনামূলক বেশি ফলন ও ভালো দাম পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত স্থানীয় কৃষকেরা। বিশেষ করে রাসায়নিকমুক্ত বা কম কীটনাশক ব্যবহার করে লাউ চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।

জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা ইউনিয়নের নলকা ঝাঁকরি গ্রামের কৃষক মো. নজরুল ইসলাম ৬০ শতক জমিতে মাচায় লাউ চাষ করেছেন। তিনি জানান, লাউ চাষে শুরুতে জমি প্রস্তুত, মাচা তৈরি, বীজ ও জৈব সারসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়েছে। তবে গাছে ফল আসার পর সেই খরচ দ্রুত উঠে এসেছে। বর্তমানে নিয়মিত লাউ বিক্রি করে ভালো আয় করছেন তিনি।

কৃষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘লাউ চাষে খুব বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। পরিচর্যা ঠিকমতো করতে পারলে অল্প জমি থেকেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। আমি ৬০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছি। এখন প্রায় প্রতিদিনই লাউ তুলতে পারছি। বাজারে দামও ভালো থাকায় লাভের আশা করছি। আগামীতে আরও বেশি জমিতে লাউ চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাইকারি ২৫ বা ৩০ টাকা করে লাউ বিক্রি করছি। এ বছর অন্তত ৬০ হাজার টাকার মত লাউ বিক্রি করার সম্ভাবনা রয়েছে।’

ছবি: টাইমস

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের ধীতপুর আলাল গ্রামের কৃষক মো. শাহাদাত হোসেন ৩০ শতক জমিতে লাউয়ের চারা রোপণ করে সফলতা পেয়েছেন। কোনো ধরনের অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার না করে জৈব সার ও প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি লাউ চাষ করছেন। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের অন্য কৃষকরাও রাসায়নিকমুক্ত সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

কৃষক মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি প্রায় এক-দেড় মাস আগে লাউয়ের বীজ লাগিয়েছি। শুরুতে জমি ভালোভাবে চাষ দিয়েছি। সার হিসেবে ফসফেট, পটাশ, ইউরিয়া ও জৈব সার ব্যবহার করেছি। এখন মাচা ভরে গেছে লাউয়ে। পাইকারি বাজারে প্রতি লাউ ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আশা করছি, সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ করতে পারব। কৃষক ভাইদের বলব-সঠিক সময়ে সঠিক পরিচর্যা করলে লাউ চাষে ভালো লাভবান হওয়া যায়।’

আরও পড়ুন

লাউ চাষে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কৃষকেরা এখন ফেরোমোন বা ‘ফুরান ফাঁদ’ ব্যবহার করছেন। এতে ফুলের মাছিসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা দমন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কমছে, উৎপাদন খরচও কমে আসছে। পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহারের কারণে উৎপাদিত লাউ তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বাড়ছে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, কৃষক শাহাদাত ভাইকে ভালো বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার ও রোগবালাই দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে লাউয়ের ঢলে পড়া রোগ প্রতিরোধে মাটি শোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তিনি কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করায় ভালো ফলন পেয়েছেন। সঠিক পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে পারলে এ চাষ তার জন্য লাভজনক হবে।

ছবি: টাইমস

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস.এম. নাসিম হোসেন বলেন, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় এ বছর প্রায় ৭০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন জাতের লাউ চাষ হয়েছে। জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে আরশ, হাইব্রিড গ্রিন ও নাইস গ্রিন অন্যতম। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পরামর্শে অনেক কৃষক এখন সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতিতে লাউ চাষ করছেন। এতে কীটনাশকের ব্যবহার কমছে, উৎপাদন খরচ হ্রাস পাচ্ছে এবং কৃষকের লাভ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাজারে বিষমুক্ত সবজির চাহিদাও বাড়ছে।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ.কে.এম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, জেলায় চলতি মৌসুমে ১৩০ হেক্টর জমিতে ৬৩২ মেট্রিক টন লাউ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। লাউ পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ সবজি। এতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, খনিজ ও পানি রয়েছে। নিয়মিত লাউ খেলে শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। কৃষকদের নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম সময়ে ফলন, তুলনামূলক কম খরচ এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় লাউ চাষ কৃষকদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বসতবাড়ির আঙিনা, পতিত জমি ও স্বল্প পরিসরের জমিতে মাচা তৈরি করে লাউ চাষ করে অনেক কৃষক বাড়তি আয় করছেন। এতে একদিকে যেমন পরিবারের সবজির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে বিক্রি করে মিলছে নগদ অর্থ।

মাচায় দুলতে থাকা সবুজ লাউয়ের পাতা আর ফুটন্ত ফুল যেন গ্রামীণ জীবনের এক অপূর্ব সৌন্দর্যের প্রতীক। কৃষকের ঘাম আর শ্রমে মাচায় মাচায় ফলছে লাউ, আর সেই ফলনেই হাসি ফুটছে কৃষকের মুখে। একই সঙ্গে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হচ্ছে সিরাজগঞ্জের গ্রামীণ অর্থনীতিও।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর