নীতিসহায়তার পরও ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ

নীতিসহায়তার পরও ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

বিশেষ ছাড়ে ঋণ নিয়মিত করেছিল ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকায় থাকা কৃষিবিদ গ্রুপ, যদিও আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সুবিধা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। খেলাপিমুক্ত হয়ে গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী আফজাল রিহ্যাবের নির্বাচনে অংশ নিয়ে সভাপতি হন। কিন্তু সুবিধা নেওয়ার পর নির্ধারিত অর্থ জমা না দেওয়ায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকার সেই ঋণ আবার খেলাপি হয়েছে।

এমন আরও ঋণ নতুন করে খেলাপির খাতায় ফিরেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটে নতুন খেলাপি যোগ হয়ে জুন শেষে দেশের খেলাপি ঋণ আবার ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। তিন মাসেই বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন খেলাপি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, নীতিসহায়তা নিয়ে ঋণ নিয়মিত করা কিছু গ্রাহক পরে আবার খেলাপি হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ নির্বাচনসহ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়মিত করেছিলেন। সেই উদ্দেশ্য পূরণের পর কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, এর সঙ্গে নতুন একটি সংকটও যোগ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আয় কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশও ঋণের কিস্তি দিতে পারছে না।

মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমানও একই সমস্যার কথা বলেছেন। তিনি টাইমসকে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমেছে। ফলে নতুন করে কিছু প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আগে বিশেষ সুবিধায় দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন করা কিছু প্রতিষ্ঠানের কিস্তি পরিশোধের সময়ও শুরু হয়েছে। তাদের অনেকে এখন সেই কিস্তি দিতে পারছে না বা দিচ্ছে না।’

এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩১ আগস্ট বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য আরও দীর্ঘ সময় দিয়েছে। এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা যোগ্য গ্রাহক এখন সর্বোচ্চ ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। আগে এই সময় ছিল ১০ বছর। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দুই বছর কিস্তি পরিশোধে বিরতিও পাওয়া যাবে।

মিজানুর রহমান বলেন, মেয়াদ ১৫ বছর করায় কিস্তির অঙ্ক কমে আসবে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট না কাটলে ছোট কিস্তিও অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিশোধ করা কঠিন হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত শিল্পে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করা।

ছাড়ে কমেছিল, আবার বাড়ছে

খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে আগের নীতিসহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ ছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে। ওই সময়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল খেলাপির পরিমাণ, যা ছিল মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।

বিশেষ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধায় বড় অঙ্কের কিছু ঋণ নিয়মিত হওয়ায় ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমেছিল।

কিন্তু সেই ধারা টেকেনি। মাত্র তিন মাস পর, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় ওঠে। ওই তিন মাসেই খেলাপি বাড়ে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এরপর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা যোগ হয়েছে।

আরও পড়ুন

২০২৫ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এক বছরে বেড়েছে ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা বা ১৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

অর্থাৎ নীতিসহায়তায় কিছু ঋণ হিসাবের খাতায় নিয়মিত হলেও সামগ্রিক খেলাপি ঋণের চাপ কমেনি।

নীতিছাড়ের পরও বাড়ছে খেলাপি

খেলাপি ঋণ কমাতে অন্তত এক দশক আগে বড় ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া শুরু হয়। ২০১৫ সালে ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা বড় গ্রাহকদের একবারের জন্য ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়।

২০১৯ সালে আরও বড় ছাড় আসে। মাত্র ২ শতাংশ নগদ জমা দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। সঙ্গে ছিল কিস্তি পরিশোধে বিরতি এবং এককালীন ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ। এরপর ২০২২ সালে পুনঃতফসিলের সাধারণ নিয়ম আরও নমনীয় করা হয়।

২০২৪ সালে আসে এককালীন ঋণ নিষ্পত্তির নতুন ব্যবস্থা। ২০২৫ সালের মার্চে এই সুবিধা নিতে প্রয়োজনীয় নগদ জমার হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়।

এর কয়েক মাস পর আবার বিশেষ নীতিসহায়তায় মাত্র ২ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ শোধের সুযোগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে দুই বছর পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে বিরতির সুযোগও রাখা হয়।

চলতি বছরের জুনে খেলাপিদের জন্য আবার বিশেষ এককালীন ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হয়।

সবশেষে গত ৩১ আগস্ট এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ সময় ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে খেলাপিদের জন্য সুবিধা বাড়লেও খারাপ ঋণের পরিমাণ না কমে উল্টো বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে সামনে কমবে

বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য মনে করছে, খেলাপি ঋণের বর্তমান বৃদ্ধি সাময়িক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেন, মূলত খেলাপি ঋণের সঙ্গে সুদ যোগ হওয়ায় অঙ্ক বেড়েছে। খেলাপি কমানোর জন্যই নতুন করে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এর প্রভাব সামনে দেখা যাবে এবং খেলাপি ঋণ কমে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ঋণের উচ্চ সুদ অনেক ভালো ব্যবসাকেও চাপে ফেলেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সময় না দিলে কারখানা বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থান আরও কমতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নানা নীতি সহায়তার মাধ্যমে এভাবে কার্পেটের নিচে ঋণ লুকিয়ে খুব একটা সুফল মিলবে না।

খেলাপির পাহাড় হলো যেভাবে

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল ২০১৯ সালের মার্চে। তখন এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। সাত বছরেরও কম সময়ে তা ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

ব্যাংকারদের মতে, ওই সময় ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্বল ঋণ যাচাই এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে বিপুল ঋণ যাওয়ার কারণে বহু সমস্যা চাপা পড়ে ছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা সামনে আসতে শুরু করে। ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম কঠোর হয়। আগে নিয়মিত দেখানো অনেক ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়। ফলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক দ্রুত বেড়ে যায়।

তাই ছয় লাখ কোটি টাকার পুরো খেলাপি ঋণ নতুন করে তৈরি হয়নি। এর বড় অংশ বহু বছরের জমে থাকা দুর্বল ঋণ, যা এখন দৃশ্যমান হচ্ছে।

কিন্তু যেই ঋণগুলো বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত করা হয়েছিল, তার কিছু আবার খেলাপির খাতায় ফেরায় উদ্বেগ বাড়ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর