স্বল্প খরচে চাষ করে ভালো দাম পাওয়ায় সাতক্ষীরায় অসময়ের তরমুজ চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। জেলার পতিত জমি, মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধসহ অনাবাদি জমিতে মাচা ও মালচিং পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে নানা জাতের তরমুজ।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় প্রায় ১৪১ হেক্টর জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষ হয়েছে। গত মৌসুমের তুলনায় এবার চাষ বেড়েছে প্রায় ৬৫ হেক্টর।
সাতক্ষীরার বিভিন্ন মাঠে এখন মাচায় ঝুলছে সুপ্রিম হানি, তৃপ্তি, ব্ল্যাক বেবি, সুগারকুইন, বাংলা লিংক, আস্থা, কানিয়া ও ড্রাগন প্লাসসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজ। নিচে কোথাও অন্য ফসল, আবার কোথাও মৎস্য ঘের। লোনা ও মিঠাপানির সংমিশ্রণ থাকা উপকূলীয় এই এলাকায় তরমুজ চাষ একসময় অনেকের কাছে ছিল অবিশ্বাস্য। এখন সেই চাষই কৃষকদের কাছে সম্ভাবনাময় আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সমতল জমিতে প্রতি বিঘা অসময়ের তরমুজ চাষে খরচ হয় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে তা বিক্রি করে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। ফলে অল্প সময়ে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা এই চাষে ঝুঁকছেন।
কয়েক বছর আগেও সাতক্ষীরা সদর, তালা, দেবহাটাসহ বিভিন্ন উপজেলার অনেক জমি পতিত পড়ে থাকত। মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধও বেশির ভাগ সময় অব্যবহৃত থাকত। কৃষি বিভাগের উদ্যোগে এসব জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে তরমুজ চাষ শুরু হয়। প্রথম দিকে লোনা পানির প্রভাবে ফলন হবে কি না, তা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে সংশয় ছিল। তবে প্রথম দফাতেই ভালো ফলন পাওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই চাষ।
তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া এলাকার কৃষক ইকবাল হোসেন মালচিং পদ্ধতিতে আস্থা, কানিয়া ও ড্রাগন প্লাস জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারেও চাহিদা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে তার কাছ থেকে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এবার ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।
তরমুজ খেতে কাজ করেন আকছেদ আলী। তিনি বলেন, এসব তরমুজের ভেতরের অংশ হলুদ কিংবা লাল হলেও খেতে সুস্বাদু। আগে এলাকায় কাজের সুযোগ কম ছিল। এখন তরমুজের খেতে কাজ করে প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন। ফলে কাজের জন্য আর বাইরে যেতে হচ্ছে না।
একই এলাকার কৃষক শিরিনা বেগম দুই বিঘা জমিতে হলুদ রঙের অসময়ের তরমুজ চাষ করেছেন। স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন প্রচেষ্টা তাকে বীজ ও সার দিয়ে সহযোগিতা করেছে। ভালো ফলন হওয়ায় তিনি মহাসড়কের পাশে বসেই তরমুজ বিক্রি করছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে দুই বিঘা জমি থেকে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি লাভের আশা করছেন তিনি।
উন্নয়ন প্রচেষ্টার কৃষিবিদ নয়ন হোসেন বলেন, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগিতায় সংস্থাটির এসপিডি এগ্রিকালচারাল কর্মসূচির আওতায় তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের ২১ জন কৃষক ২৮ বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে অসময়ের তরমুজ চাষ করেছেন। কৃষকদের বীজ, জৈব সার, জৈব কীটনাশক ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কৃষকেরা পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে তরমুজ বিক্রি করছেন।
তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরার মাটি তরমুজ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। ফলন ও লাভ ভালো হওয়ায় আগামীতে এ অঞ্চলে চাষ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষিতে শিক্ষিত তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষিকাজের মাধ্যমে তরুণরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
উন্নয়ন প্রচেষ্টার নির্বাহী পরিচালক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন ও আয়বর্ধক বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠান। কৃষকদের নতুন ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করতে অসময়ের তরমুজ চাষে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকেরা অল্প সময়ে ভালো লাভ পাচ্ছেন।
প্রতি বিঘায় কৃষকের ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হচ্ছে বলেও জানান তিনি। সংস্থার পক্ষ থেকে কৃষকপ্রতি ১৫ হাজার টাকা সহায়তা এবং স্বল্প সুদে মৌসুমি ঋণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সাতক্ষীরার অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, ২০২০ সাল থেকে জেলার কৃষকদের গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রথমে জিকেবিএসপি, পরে এসএসসিপি এবং বর্তমানে সিসিইপি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ, সার ও মাচা তৈরির উপকরণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃষকদের আগ্রহের কারণে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় প্রায় ১৪১ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে। এ তরমুজ সুস্বাদু এবং বাজারমূল্যও ভালো। উপজেলা কৃষি অফিস ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ, উন্নত বীজ সরবরাহ এবং প্রদর্শনী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অসময়ের তরমুজের মধ্যে সুপার কিং, তৃপ্তি, ব্ল্যাক বেরি ও ইয়োলো বোর্ড জাতের চাষ বেশি হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পতিত জমি ও মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধ কাজে লাগিয়ে অসময়ের তরমুজ চাষ শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, উপকূলীয় কৃষিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সাতক্ষীরার এই চাষ পদ্ধতি ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


