রাজশাহীতে কৃষকের সংখ্যা চার লাখ ১২ হাজারের বেশি। বিপুল এই কৃষক জনগোষ্ঠীর বিপরীতে সেপ্টেম্বর মাসে পুরো জেলার জন্য টিএসপি সারের বরাদ্দ হয়েছে মাত্র এক হাজার ৪৫ মেট্রিক টন। এই পরিমাণ সার এক বস্তা করে দেওয়া হলে তা পৌঁছাবে মাত্র ২০ হাজার ৯০০ কৃষকের কাছে। অর্থাৎ জেলার মোট কৃষকের তুলনায় এই বরাদ্দের আওতায় আসবেন খুবই অল্পসংখ্যক কৃষক। কৃষকের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সারের বরাদ্দের এমন অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) রাজশাহী জেলা ইউনিট।
রোববার দুপুরের দিকে নগরীর রেলগেট এলাকার সংগঠনটির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা তুলে ধরেন বিএফএ রাজশাহী জেলা ইউনিটের সভাপতি ওছমান আলী।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, রাজশাহীতে সরকারি গুদামে সারের মজুত নিয়ে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। বাফার ও বিএডিসির গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। তবে কৃষকের চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম হওয়ায় ডিলার পর্যায়ে চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিএফএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে রাজশাহী জেলায় টিএসপি এক হাজার ৪৫ মেট্রিক টন, এমওপি এক হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন এবং ডিএপি তিন হাজার ১৫ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর।
সংগঠনটির নেতারা বলছেন, বর্তমান বরাদ্দ চার লাখ ১২ হাজারের বেশি কৃষকের মধ্যে সমানুপাতিক হারে ভাগ করলে একজন কৃষকের ভাগে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ কেজি টিএসপি, ৪ কেজি এমওপি ও ৭ কেজি ডিএপি পড়ে। তাদের মতে, কৃষকের প্রকৃত চাহিদা ও আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে সারের বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি।
সারের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখতে সাত দফা দাবি জানিয়েছে বিএফএ। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—কৃষকের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ বৃদ্ধি, সংকটপূর্ণ এলাকায় দ্রুত উপ-বরাদ্দ, মাছ চাষের পুকুরের জন্য পৃথক সার বরাদ্দ, ডিলারদের কমিশন পুনর্নির্ধারণ এবং কৃষকদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সার ব্যবহারে পরামর্শ দেওয়া।
রাজশাহীতে বিসিআইসির ৮৬ জন ও বিএডিসির ১৩০ জনসহ মোট ২১৬ জন ডিলার রয়েছেন। এর বাইরে ৪৭৫ জন কার্ডধারী খুচরা বিক্রেতা সার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত। ডিলারদের দাবি, তারা সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন করে নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রি করছেন। কোনো ডিলার অনিয়ম করলে তার দায় পুরো ডিলার সমাজের ওপর চাপানো উচিত নয়।
সংবাদ সম্মেলনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সার নিয়ে ‘ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর’ তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেন ডিলাররা। তাদের দাবি, এসব তথ্যের কারণে কৃষকদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। এর সুযোগে কেউ কেউ প্রয়োজনের আগেই সার কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন।
ডিলারদের ভাষ্য, আগামী নভেম্বরের আলু ও পেঁয়াজ চাষকে কেন্দ্র করেও এখন থেকেই সার সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রকৃত প্রয়োজনের সময় সারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
তারা আরও বলেন, অনেক কৃষক কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শের চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করছেন। এতে সারের চাহিদা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই কৃষকদের সুষম ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সার ব্যবহারে কৃষি বিভাগের পরামর্শ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বিএফএর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর পুকুরে মাছ চাষ হয়। এসব পুকুরেও সার ব্যবহৃত হয়। তাই কৃষিজমির পাশাপাশি মাছ চাষের পুকুরের জন্যও পৃথকভাবে সার বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনের নেতারা বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রিতে তারা বদ্ধপরিকর। বর্তমানে ইউরিয়া ও টিএসপি প্রতি বস্তা এক হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি এক হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি এক হাজার টাকা দরে বিক্রির জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ আব্দুল গণি, নির্বাহী সদস্য সাইদুর রহমান ভুট্টো, লাল মোহাম্মদ সরদারসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।


