সৌদি আরবে গিয়েছিলেন পরিবারের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে। কেউ চেয়েছিলেন সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে, কেউ পরিবারকে একটু ভালো রাখতে। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। রিয়াদের সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে প্রাণ হারানো নওগাঁর আত্রাইয়ের চার প্রবাসী ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।
শুক্রবার বিকালে গণ্ডগোহালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে চারজনের জানাজা হয়। পরে গ্রামের কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় তাদের।
একই কবরস্থানে পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন দুই ভাই মোহন আলী ও সুমন আলী। তাদের কাছেই দাফন করা হয় রুবেল প্রামাণিক ও কলিমুদ্দিনকে। একই গ্রামের চারজনের একসঙ্গে জানাজা ও দাফনে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে গণ্ডগোহালী।
জানাজা শেষে স্বজনেরা শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখেন। এরপর চারটি মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের কবরস্থানে। সেখানে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
গণ্ডগোহালী গ্রামের বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, ‘৪৭ বছরের জীবনে কখনো একসঙ্গে এতগুলো মরদেহ দাফন করতে দেখিনি। একই গ্রামের চারজন এভাবে একসঙ্গে চলে গেলেন। এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এমন দৃশ্য যেন আর কোনো গ্রামকে দেখতে না হয়।’
আরেক বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ছেলেগুলো আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছে। এখন বিশ্বাসই হচ্ছে না, তারা আর কোনোদিন এই গ্রামে ফিরবে না। পরিবারগুলো এক মুহূর্তে যেন সবকিছু হারিয়ে ফেলল।’
দুই ছেলেকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি
মোহন ও সুমন আলীর মা ময়না খাতুন। দুই ছেলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ময়না খাতুন বলেন, ‘এতগুলো দিন আমি ঘুমাইতে পারি নাই। আগুনে আমার ছেলে দুটাকে একবারে কয়লা বানায়া দিছে। নিজের চোখটারে বিশ্বাস করতে পারতেছি না যে এরা আমার সেই সোনা বাজান। আল্লাহ, তুমি আমারে এত বড় কষ্ট কেন দিলা?’
ছেলেদের সঙ্গে শেষ কথার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে দুটো বলত, মা আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরব। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করব। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে সুখে থাকব। আমার দুনিয়া থেকে সবকিছুই চলে গেল। আমার আর কিছু থাকল না।’
ময়না খাতুন জানান, তার স্বামী প্রতিবন্ধী। দুই ছেলেকে হারিয়ে সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।
পরিবারের ভরসা হারালেন অনেকে
গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত কলিমউদ্দিনের বাবা বজলুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে গেল আমাগো ভাগ্যের চাকা ঘুরাইতে, আর আমরা পাইলাম ওর লাশ! ওখানকার ফ্যাক্টরিতে কোনো নিরাপত্তা আছিল না কেন? আমার ছেলের মতো আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়।’
উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের মা সাফিয়া খাতুন বলেন, ‘ছেলেটাই আছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। পেটের টানেই তোরে পাঠাইছিলাম দেশের বাইরে। আগুনে সব শেষ হয়া গেল রে! এখন আমি এই সংসার নিয়া কই যামু?’
ডুবাই গ্রামের সোহেল রানার বাবা বাদল তরফদার বলেন, ‘একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশের বাইরে পাঠায়ছিলাম। এখন আমার তো আর কেউ নাই রে বাবা! তুই ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছিল?’
গণ্ডগোহালী গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘যে ছেলেগুলো মারা গেল, তারা সবাই পরিবারের উপার্জনের একমাত্র উৎস ছিল। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবেও ভেঙে পড়েছে।’

এখনো স্বজনদের অপেক্ষা
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ বৃহস্পতিবার দেশে আনা হয়। তাদের সাতজন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা।
নওগাঁর এই সাতজন হলেন মো. ফরিদ, রুবেল প্রামাণিক, মোহন আলী, সুমন আলী, কলিমুদ্দিন, সোহেল রানা ও আব্দুল জলিল সরদার।
তবে এখনো কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। তাদের স্বজনেরা মরদেহ ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।
আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি বলেন, ‘কতদিন ধইরা ছেলের মুখটা দেখার জন্য ব্যাকুল হইয়া আছি। হামার ছাওয়ালের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি। সরকারের কাছে আবদার, হামার ছেলের লাশ য্যান দ্রুত নিয়ে আসে।’
নওগাঁ জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বাকি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত ও দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।


