বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী মহলকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের মতো বাংলাদেশের প্রতিটি জেলারও স্বতন্ত্র সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে নীতিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নিয়েছে।
শনিবার ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস আয়োজিত দেশটির স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সমান সুযোগ পাবে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে অ্যামচ্যামের সদস্যদের সাফল্য আমাদের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। কারণ, কোনো একটি মার্কিন কোম্পানি যদি বাংলাদেশে সফল হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানই আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শুভেচ্ছাদূত বা ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরে পরিণত হবে। একই বিষয় অন্যান্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘নতুন সরকার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা, বিদেশি বিনিয়োগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাতে হবে, বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে এবং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আপনারা নিজ নিজ দেশে ফিরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন একজন শুভেচ্ছাদূত হিসেবে। আমরাও বাংলাদেশে থেকে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে আপনাদের সহযোগিতা করব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি যত এগিয়ে যাচ্ছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। সৌভাগ্যবশত, নতুন সরকার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও কাজ শুরু করেছে। আমরা উপলব্ধি করি, দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি শাসনব্যবস্থা চলেছে, যা জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল না। তাই আমরা এখন প্রতিটি খাতের জন্য একটি সুস্পষ্ট উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। এটি বেসরকারি খাতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কারণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবসময় বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে বেসরকারি খাত বিকশিত হতে পারে।’
সরকার বেসরকারি খাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ ও কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন করতে চাই, যা বেসরকারি খাতের উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে। এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এমন অনেক কর্মসূচি রয়েছে, যেখানে আমরা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে চাই। একইভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) প্রকল্পেও আমরা আরও বেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করি।’
মুখপাত্র তার বক্তব্যে দেশের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান ব্যবসাবান্ধব সরকার জাতীয় বাজেটে উদার অর্থনৈতিক নীতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যাপক হারে কমিয়েছে। অতীতে যাকে ‘মেধাপাচার’ বা ব্রেইন ড্রেইন বলা হতো, সেটিকে এখন মেধার ইতিবাচক আদান-প্রদান বা ‘ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপ দিতে সরকার কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই লভ্যাংশ বা মুনাফা বিদেশে স্থানান্তরের দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর করা হয়েছে। পাশাপাশি কর রেয়াত, বিশেষ প্রণোদনা, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং হাইটেক পার্কের মতো সুবিধা সচল রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সরকার একটি সমতাভিত্তিক ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় বলে জানান মাহদী আমিন। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ধারাবাহিক সংলাপের পাশাপাশি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উদ্যোক্তাদের মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করা হবে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে বোয়িং থেকে শুরু করে জ্বালানি খাত, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি, ওষুধ এবং তৈরি পোশাকশিল্পে যৌথভাবে কাজ করার বিপুল সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যান্য সদস্যদের ইতিবাচক ভূমিকা ও অনুপ্রেরণামূলক অবদানের জন্য গভীরভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যার ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, ‘আমি এমন একটি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছি, যা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। আমাদের সরকারের শক্তির উৎস জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্খা। জনগণের বিপুল সমর্থনে আমরা যে বিজয় অর্জন করেছি, তার অর্থ হলো আমাদের কাঁধে এখন আরও বড় দায়িত্ব এবং মানুষের অনেক বেশি প্রত্যাশা রয়েছে। আমরা সেই প্রত্যাশা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। মানুষের প্রত্যাশা হলো, স্বচ্ছতার মাধ্যমে সেবা দেওয়া, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সুশাসনের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।’
তিনি বলেন, মানুষ চায় বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাক। তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি দেখতে চায়, নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত হোক, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাক এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হোক। এই ক্ষেত্রে অ্যামচ্যাম অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো শুধু বিনিয়োগই নিয়ে আসে না; তারা উন্নত কর্মপদ্ধতি, উদ্ভাবন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জ্ঞান স্থানান্তরের সুযোগও নিয়ে আসে। এগুলো আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বুঝি, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বিশ্বের সেরা অভিজ্ঞতা ও কার্যকর পদ্ধতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সেগুলো দেশের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমরা চাই, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে এসে বিনিয়োগ করুক এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশেও সহায়ক ভূমিকা পালন করুক।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের আরেকটি বড় শক্তি হলো বিপুল জনসংখ্যা। আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। বিনিয়োগকে সহায়তা করার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি আমাদের রয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের একটি বড় অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখায় অ্যামচেম ও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।


